নিজের ভালোবাসাকে খুঁজে ফিরতে এক নারীর দুর্গম পথচলা! রাজনৈতিক অশান্তি, রহস্যে ঘেরা নিখোঁজ হওয়া - এই বাংলা গল্পটিতে অদিতির অবিশ্বাস্য যাত্রা।

অগ্নিপথের সন্ধানে

নিজের ভালোবাসাকে খুঁজে ফিরতে এক নারীর দুর্গম পথচলা! রাজনৈতিক অশান্তি, রহস্যে ঘেরা নিখোঁজ হওয়া - এই বাংলা গল্পটিতে অদিতির অবিশ্বাস্য যাত্রা।

রাতের আকাশ কলকাতার উপর কালো কাপড়ের মতো ঝুলছে। অদিতি, বারান্দায় দাঁড়িয়ে শহরের আলোকঝলমলে দৃশ্যের দিকে চেয়ে আছে। এই শহর তার কাছে এখনো অপরিচিত, এক বিশাল, গমগম করছে জনসমাগম। মাত্র ছয় মাস আগে সে ঢাকা ছেড়ে এসেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কবল থেকে পালিয়ে। এখানে তার একমাত্র আশ্রয় তার কাকিমা, যিনি বহু বছর আগে এই শহরে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

অদিতির মনের মধ্যে এক অসমাপ্ত গল্পের ছায়া ঘুরে বেড়ায়। তার প্রথম প্রেম, রাহুল, ঢাকার রাস্তায় একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে কিছু কিছু গুজব শোনা গিয়েছিল, কিন্তু রাহুলের কি হয়েছিল, তা কখনো জানা যায়নি। এই অজানা পরিণতিই অদিতিকে পীড়া দেয় সবচেয়ে বেশি।

একদিন বিকেলে কলেজ থেকে ফিরছিল অদিতি, হঠাৎ দেখে এক চেনা মুখ। বছরখানেক আগে ঢাকায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল ঐশ্বর্যর। কিন্তু এখানে কলকাতায়? ঐশ্বর্য ছিল রাহুলের বন্ধু। হয়তো সে রাহুলের খবর জানে! মনের উত্তেজনা চেপে রাখতে না পারা অদিতি ঐশ্বর্যকে ডেকে ফেলে।

ঐশ্বর্য অবাক হয়ে যায় অদিতিকে দেখে। জানতে চায় কী করে সে এখানে। অদিতি তার সব কথা খুলে বলে, ঢাকার অশান্তি, রাহুলের নিখোঁজ হওয়া, তার মনের অস্থিরতা। ঐশ্বর্য মুখ গম্ভীর করে শোনে সবকথা। তারপর আস্তে আস্তে বলে, “অদিতি, রাহুলের খবর খুবই খারাপ।”

অদিতির পায়ের নিচে থেকে মাটি সরে যায় মনে হয়। ঐশ্বর্য জানায়, রাহুলকে সন্দেহে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। পরে আর কিছু জানা যায়নি। অদিতির চোখে জল এসে যায়। কিন্তু একই সঙ্গে একটা জেদ জাগে তার মধ্যে। সে রাহুলের খোঁজঁ পাবে, যেভাবেই হোক।

ঐশ্বর্য অদিতিকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেয়। দু’জনে মিলে খোঁজখবর নেয় বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু রাহুলের কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। হতাশায় ভেঙে পড়তে যাচ্ছিল অদিতি, ঠিক সেই সময় ঐশ্বর্য একটা পুরোনো খাতার খুঁজে পায়।

খাতাটি ছিল রাহুলের। তার মধ্যে লেখা কিছু গোপনীয় নোট, কিছু মানচিত্র। দেখে মনে হয় কোনো একটা গোপন সংগঠনের তথ্য। ঐশ্বর্য বুঝতে পারে, রাহুল হয়তো কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। এই খাতাটিই হয়তো তার জীবনের জন্য বিপদ ডেকে এনেছিল। কিন্তু খাতাটির লেখাগুলো এতো গূঢ় যে, তা থেকে রাহুল কোথায় আছে, সেটা বোঝা দায়।

অদিতি এখন আর হাল ছেড়ে দেয়নি। সে ঐশ্বর্যের সঙ্গে মিলে ঐসব গোপনীয় নোট ও মানচিত্রের রহস্য উদঘাটনে মনোনিবেশ করলো। তারা ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বললো, লাইব্রেরি ঘাঁটলো। অদিনের রাত্রি, ঐশ্বর্যের দিন – এভাবেই চলতে লাগলো তাদের খোঁজা।

একদিন একটি পুরোনো খবরের কাগজের পাতায় অদিতির নজর পড়ল। সেখানে ছিল একটা ছবি – একটা দূর্গম পাহাড়ি এলাকার, যেখানে একটি বিখ্যাত বিপ্লবী দলের আস্তানা ছিল ব্রিটিশ রাজের সময়। হঠাৎ অদিতির মনে পড়ল, রাহুলের মানচিত্রের মধ্যেও এই রকম পাহাড়ের আঁচড় দেখেছিল সে। সে ঐশ্বর্য-কে ডেকে দেখালো খবরের কাগজটা।

ঐশ্বর্য চিন্তায় পড়ে গেল। সে জানতো, ঐ বিপ্লবী দল এখনো গোপনে সক্রিয় আছে। রাহুল হয়তো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলেছিল। কিন্তু সেই এলাকা খুবই বিপজ্জনক, যেখানে সাধারণ মানুষের ঢোকা নিষেধ।

অদিতি আর থাকতে পারলো না। রাহুলকে যেভাবেই হোক, সে খুঁজে বের করবে। ঐশ্বর্যকে বোঝালো তার দৃঢ়তা। অবশেষে ঐশ্বর্য রাজি হলো অদিতিকে সাহায্য করতে। তারা দু’জনেই জানতো, এই পথ কাঁটা-ক খড়ে ভরা, কিন্তু তারা পিছিয়ে আসতে পারলো না।

দীর্ঘদিনের পথ চলার পর অবশেষে তারা পৌঁছলো সেই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। পাহাড়ের গায়ে গিয়ে স্থানীয় ভাষায় কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে দেখা হলো। অদিতি জানতে চাইল, বিপ্লবী দলের সম্পর্কে। গ্রামবাসীরা সাবধানে উত্তর দিল, “এখানে এসব নিয়ে কথা বলা ঠিক নয়।” কিন্তু অদিতির চোখের জল দেখে তারা একটু সাহায্য করলো। তারা জানালো, পূর্ণিমার রাতে পাহাড়ের চূড়ায় একটা আগুন জ্বলে, সেটাই হলো বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগের নিশান।

অদিতি ও ঐশ্বর্য পূর্ণিমার রাতের অপেক্ষায় থাকে। দিনগুলো কাটে অসহনীয় উত্তেজনা আর শঙ্কা নিয়ে। পাহাড়ের নিবিড় অরণ্যে রাতের আঁধারে জংলী জন্তু জানোয়ার-এর ডাক, পাহাড়ি ঝোড়ো হাওয়ার গর্জন – সবকিছুই তাদের স্নায়ু চাড়া চেঁড়া করে। কিন্তু অদিতি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সে যত বাধাই আসুক, সে রাহুলকে খুঁজে বের করবে।

অবশেষে পূর্ণিমার রাত এলো। আকাশ ঝলমলে তারা, আর চাঁদের আলোয় পাহাড়ের চূড়াগুলো সোনার মতো ঝিলমিল করছে। অদিতি ও ঐশ্বর্য নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে চেয়ে আছে আকাশের দিকে। হঠাৎ, দূরে পাহাড়ের কোণে একটা আলো জ্বলে উঠলো।

আগুন! নিশ্চই বিপ্লবীদের সংকেত। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোই বা কীভাবে? পাহাড়ের সেই দুর্গম পথ, অন্ধকার রাত – সবকিছুই বাধা। ঠিক সেই সময়, কাছের ঝোপের আড়াল থেকে একটা বৃদ্ধ মানুষ এগিয়ে এলো।

সেই বৃদ্ধ স্থানীয় গ্রামবাসী ছিলেন। সে জানতো অদিতিদের উদ্দেশ্য। বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের ঝুঁকি সে জানত, কিন্তু অদিতির আত্মবিশ্বাসী চেহারা দেখে তিনি সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

বৃদ্ধটি তাদের একটা গোপন পথ দেখালো, যেটা পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছায়। পথটা কঠিন ছিল, কিন্তু অদিতি ও ঐশ্বর্য দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চললো। কয়েক ঘন্টা পর তারা পৌঁছলো পাহাড়ের চূড়ায়।

সেখানে একটা গুহার মুখ দেখা গেল। বৃদ্ধ জানালো, এই গুহার ভিতরেই বিপ্লবীদের আস্তানা। অদিতি ও ঐশ্বর্য গুহার মধ্যে ঢুকলো। ভিতরে অন্ধকার, একটা মশাল জ্বালিয়ে তারা এগিয়ে চললো। কিছুদূর যাওয়ার পর কয়েকজন মানুষের সঙ্গে দেখা হলো।

নেতা, একজন বয়স্ক মানুষ্য, অদিতিদের কথা শুনলেন। রাহুলের খাতাটি দেখিয়ে অদিতি বুঝিয়ে বললো তার প্রেমিকের কথা, হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার রহস্য। নেতা চিন্তায় পড়ে গেলেন। খাতাটি দেখে তিনি বুঝতে পারলেন, রাহুল তাদের গোপনীয় তথ্য জেনে ফেলেছিল। কিন্তু রাহুলের কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না, সে হয়তো এই তথ্য প্রকাশ করে সরকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চেয়েছিল।

কিন্তু বিপ্লবী দলের নিয়ম অনুযায়ী, গোপনীয়তা রক্ষা করা সবচেয়ে বড়ো কাজ। তাই রাহুলকে এক নিরাপদ আস্তানায় রেখেছিল তারা, যেখানে সরকারের হাত থেকে সে সুরক্ষিত থাকবে। কিন্তু সেই আস্তানা কোথায়, সেটা নেতাও নিশ্চিত করে বলতে পারলেন না। তবে তিনি অদিতিকে আশ্বাস দিলেন, যুদ্ধ থামলেই রাহুলকে ফিরিয়ে আনা হবে।

এই খবরে অদিতির মন খারাপ হয়ে গেল। সে আশা করেছিল রাহুলকে নিয়েই ফিরবে। কিন্তু এখন অপেক্ষা করতে হবে যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত। তবু সে হাল ছেড়ে দেয়নি। সে জানে, রাহুল জীবিত আছে, সে নিরাপদে আছে, এটাই এখন তার কাছে সবচেয়ে বড়ো সান্ত্বনা।

অদিতি ঐশ্বর্যের সঙ্গে সেই গুহা থেকে বেরিয়ে এলো। পূর্বের পথ দিয়েই তারা নেমে এলো পাহাড় থেকে। সকাল হতেই তারা বিদায় নিল সেই বৃদ্ধ মানুষ্যের কাছ থেকে। ফিরে এলো কলকাতায়।

এরপর দীর্ঘদিন অপেক্ষা। অদিতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে খবর রাখলো। যুদ্ধের অবসান ঘটলেই সে বিপ্লবী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করলো। অবশেষে যুদ্ধ শেষ হলো। বিপ্লবীরা জয়ী হলো।

নেতার দেওয়া আশ্বাস মতো, রাহুলকে ফিরিয়ে আনা হলো। অদিতির সঙ্গে দেখা হলো তার। দীর্ঘদিনের বিচ্ছেদ, অজানা পরিস্থিতির মধ্যে দু’জনেরই চেহারায় বদল এসেছে। কিন্তু দু’জনের মনের মধ্যে ভালোবাসা অটুট ছিল।

এই পুরো অভিজ্ঞতা অদিতিকে পাল্টিয়ে দিয়েছে। সে আর আগের সেই সহজ-সা মেয়ে নেই। সে এখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সাহসী। সে জীবনে নতুন করে যাত্রা শুরু করলো, রাহুলের পাশে থেকে। তারা দু’জনে মিলে ঢাকায় ফিরে গেল, নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে গেল।

অগ্নিপথের মতো কঠিন পথ অতিক্রম করে অদিতি তার হারানো প্রেমকে ফিরে পেয়েছে। এই ফিরে পাওয়া তার কাছে জীবনের সবচেয়ে বড়ো জয়। সে জানে, জীবনে চড়াই-উৎরাই থাকবেই, কিন্তু ভালোবাসার শক্তি দিয়ে সে সব বাধা অতিক্রম করতে পারবে।

এই রকম চিত্তাকর্ষক বাংলা ছোট গল্প -এর আপডেট পেতে আমাদের WhatsApp চ্যানেল জয়েন করুন।

নতুন বাংলা ছোট গল্প

প্রতিদ্বন্দ্বী

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: প্রতিদ্বন্দ্বী

শেষ জমিদারের মেয়ে

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: শেষ জমিদারের মেয়ে

স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

শিউলি, এক গ্রামের মেয়ে, তার অসাধারণ গানের প্রতিভা দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করে। কিন্তু খ্যাতির পথে তাকে অতিক্রম করতে হয় অনেক বাধা। এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পে দেখুন কীভাবে সে তার স্বপ্ন পূরণ করে এবং সকলের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

Leave a Comment

অনুলিপি নিষিদ্ধ!