এই বাংলা গল্পটিতে রহস্য, রোমাঞ্চ ও পরিচয়ের খোঁজ মিশে আছে। একটি হোর্ডিংয়ের ছবি সোহিনী ও অর্জুনকে অতীতের সাথে মুখোমুখি করে দেয়। রহস্যের জাল আরও জটিল হলে, তারা তাদের আসল পরিবারের খোঁজ পায়।

অজানা ছবির রহস্য

এই বাংলা গল্পটিতে রহস্য, রোমাঞ্চ ও পরিচয়ের খোঁজ মিশে আছে। একটি হোর্ডিংয়ের ছবি সোহিনী ও অর্জুনকে অতীতের সাথে মুখোমুখি করে দেয়। রহস্যের জাল আরও জটিল হলে, তারা তাদের আসল পরিবারের খোঁজ পায়।

কলকাতার বুকে, একটি রাস্তার কোণে, অবাক হয়ে দাঁড়িয়েছিল সোহিনী আর অর্জুন। রাস্তার অপরদিকে বিশাল হোর্ডিংয়ে তাদের নিজেদের ছবি! অবিশ্বাস্য চোখে সেই ছবির দিকে তাকিয়ে রইল সোহিনী। কোনোদিন কী এই ছবি তোলা হয়েছিল, তার কোনো স্মৃতিই তার মনে নেই। অর্জুন, একজন ধীরস্থির ব্যবসায়ী, সেও ছিল চমকে গিয়ে। এই রহস্যের গভীরে ডুব মারার সিদ্ধান্ত নিল তারা।

সোহিনী, একজন সূক্ষ্মদৃষ্টি সম্পন্না শিল্পী, মনোযোগ সহকারে ছবিটি পরীক্ষা করতে লাগল। তার মস্তিষ্ক তত্ত্বের জালে জড়িয়ে গেল। কিন্তু অর্জুন, তার বাস্তববাদী চিন্তাভাবনা নিয়ে সোহিনীর আত্মবিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করল। এইভাবে তাদের সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা জাগল। তারা একসঙ্গে রহস্যের সূত্র খুঁজতে শুরু করল। 

ছবিটির নিচে লেখা ছিল, “আপনার অতীত আপনাকে ডাকছে”। এই কথাগুলো সোহিনীর মনে অস্থিরতা জাগাল। অতীতের কোন অধ্যায়? কোন সম্পর্ক? অর্জুন, সবসময়ের মতো, বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বলল, “এটা হয়তো কোনো বাণিজ্যিক কৌশল। কোনো প্রতিষ্ঠানের নতুন প্রচারের অংশ হতে পারে।” কিন্তু সোহিনী তার কথায় সায় দিতে পারল না। ছবিতে তাদের পোশাক, চারপাশের পরিবেশ – সবকিছুই অচেনা ঠিকই, কিন্তু একটা অদ্ভুত পরিচিতিও সেই ছবিতে লেগে ছিল।

তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, ছবিটি যেখানে তোলা হয়েছে, সেই জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। কিছু গবেষণা করে জানতে পারল, ছবিটির পটভূমিতে থাকা ঐ ঐতিহ্যবাহী দালানটি দার্জিলিংএর কাছেই অবস্থিত। আর সেই দালানটি এখন পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য বন্ধ। উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল। কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে সেই জায়গায়, যা তাদের অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে?

দার্জিলিং যাত্রা শুরু হল। পাহাড়ের চড়াই-উৎরাই রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় সোহিনী লক্ষ্য করল অর্জুন চুপচাপ। হয়তো সেও এই রহস্যের জালে আটকা পড়েছে একটু একটু করে। দার্জিলিং পৌঁছে তারা জানতে পারল, ঐ দালানটি ছিল এক বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর। সেই চিত্রশিল্পী নিঃসন্তান ছিলেন এবং কয়েক বছর আগে মারা যান। তিনি তার সম্পত্তি একটি ট্রাস্টের অধীনে রেখে যান, যার উদ্দেশ্য ছিল নতুন, প্রতিভাবান শিল্পীদের পৃষ্টপোষণ করা।

অর্জুন কিছু খোঁজখবর নিলেল ট্রাস্টের কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে। কিন্তু তারা জানালেন, দালানটি এখনো পর্যন্ত সংস্কারের কাজ চলছে এবং কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। হতাশ হলেও সোহিনী হার মানতে রাজি ছিল না। সে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারল, ঐ চিত্রশিল্পীর একমাত্র আত্মীয় ছিলেন তার ভাইজি। কিন্তু সে নিউজিল্যান্ডে থাকেন এবং খুব কমই দেশে আসেন।

এই নতুন তথ্য তাদের আরও বিভ্রান্ত করল। এই চিত্রশিল্পীর সঙ্গে তাদের কী সম্পর্ক থাকতে পারে? হঠাৎ সোহিনীর মনে একটা স্মৃতি জাগল। ছোটবেলায় তার বাবা-মা তাকে একবার দার্জিলিং নিয়ে এসেছিলেন। সেই সময় তারা এক অদ্ভুত দালানের সামনে ছবি তুলেছিলেন। এখন মনে হচ্ছে, সেই দালানটিই হতে পারে হোর্ডিংয়ে দেখা দালানটি। কিন্তু তার ছোটবেলার সেই স্মৃতি খণ্ডিত, অস্পষ্ট।

অর্জুনের পরামর্শে তারা সোহিনীর বাবা-মার সঙ্গে দেখা করলেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে গেলেও সোহিনীর বাবা, সুব্রত, মেয়ের কথা শুনে চমকে উঠলেন। তিনি স্মৃতি কাতুর মনে করে বললেন, “হ্যাঁ, ঠিক আছে। ছোটবেলায় তোমাকে দার্জিলিং নিয়ে গিয়েছিলাম। আর সেই সময় এক অদ্ভুত দালানের সামনে তোমার ছবি তুলেছিলাম। কিন্তু সেই দালানের নাম বা কাহিনী, কিছুই মনে নেই।”

এই নতুন তথ্যে একটু আশা জাগল তাদের মনে। হোর্ডিংয়ের ছবিটিও কি ছোটবেলার সেই ছবি থেকে নেওয়া হতে পারে? কিন্তু কে এটা করল, আর কেন? প্রশ্নের জাল আরও জটিল হয়ে উঠল। সোহিনী আর অর্জুন সিদ্ধান্ত নিলেন, সুব্রতের পুরনো অ্যালবামগুলো ঘাঁটবেন। হয়তো সেখানে কোনো সূত্র পাওয়া যেতে পারে।

পুরনো ছবি আর কাগজপত্রের পাতায় হারিয়ে গেল কয়েক ঘণ্টা। হঠাৎ সোহিনী চমকে উঠল। সে একটি পুরনো পোস্টকার্ড বের করল। তার পেছনে লেখা ছিল, “দার্জিলিং, ১৯৮৫। শ্রী অমলকান্ত রায়ের অতিথিশালায় সুন্দর অবকাশ।” ছবির সঙ্গে মিলে গেল হোর্ডিংয়ের দালানটি!

অমলকান্ত রায়! নামটি সোহিনীর মনে কোনো ঘণ্টা বাজাল না। তবে সুব্রত চিন্তায় পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর তিনি বললেন, “এই অমলকান্ত রায় ছিলেন একজন বিখ্যাত শিল্পসত্ত্ববিদ। আমি আমার আর্ট গ্যালারি চালু করার সময় তার সঙ্গে কিছুটা যোগাযোগ ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সেই যোগাযোগ আর থাকেনি।”

এই নতুন তথ্যে আরও রহস্যের স্তর খুলে গেল। অমলকান্ত রায়ের সঙ্গে সোহিনী বা অর্জুনের কোনো সম্পর্ক থাকার কথা না। তাহলে কেন তাদের ছবিটি ওই পোস্টকার্ডের দালানে তোলা হল? আর কীভাবে সেই ছবি এখন হোর্ডিংয়ে এসে পড়ল? রাত বাড়তে থাকল, কিন্তু রহস্যের কোনো সমাধান মিলল না।

পরের দিন সকালে সোহিনী আর অর্জুন সিদ্ধান্ত নিলেন, অমলকান্ত রায়ের সম্পর্কে আরও খোঁজখঁজ করবেন। তারা তার পুরনো বাসস্থান খুঁজে বের করলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলেন, বাসাটি এখন আর নেই। তার জায়গায় একটা নতুন আধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক দাঁড়িয়ে আছে।

হতাশা নেমে এল তাদের মনে। কিন্তু হঠাৎ অর্জুনের চোখে পড়ল রাস্তার ধারে একটা পুরনো বইয়ের দোকান। হয়তো সেখানে অমলকান্ত রায়ের সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যেতে পারে। দোকানে ঢুকে তারা একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন। তিনিই দোকানের মালিক, মৃদু স্বরে তাদের কথা শোনার পর তিনি বললেন, “অমলকান্ত রায়ের কথা বলছেন? হ্যাঁ, তিনি এই এলাকার খুব একজন সম্মানীয় ব্যক্তি ছিলেন। বিশেষ করে তার শিল্পের প্রতি ভালোবাসা সবার জানা। তবে কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান।”

অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি জানেন, তার কোনো আর্ট গ্যালারি বা এমন কোনো জায়গা ছিল, যেখানে তিনি নতুন শিল্পীদের পৃষ্টপোষণ করতেন?”

দোকানদার একটু চিন্তা করে বললেন, “এমন কোনো গ্যালারি তো আমার মনে নেই। তবে হ্যাঁ, শুনেছিলাম তিনি দার্জিলিংএ একটা পুরনো দালান কিনেছিলেন। সেখানে নাকি তিনি নতুন, প্রতিভাবান শিল্পীদের কাজ দেখতেন।”

এই কথা শুনে সোহিনী ও অর্জুনের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। পোস্টকার্ডের ছবির সঙ্গে মিলিয়ে তারা বুঝতে পারল, হোর্ডিংয়ে দেখা দালানটিই অমলকান্ত রায়ের দার্জিলিংয়ের সেই আস্তানা। কিন্তু প্রশ্ন হল, তাদের ছবি সেখানে কীভাবে গেল? আর কে তাদের এই রহস্যের জালে ফেলল?

“আপনি কি জানেন, কীভাবে বা কখন অমলকান্ত রায়ের সেই দালানটি ভেঙে ফেলা হল?” জিজ্ঞাসা করল সোহিনী।

দোকানদার মাথা নাড়লেন, “না, এসব খবর আমার কাছে নেই। তবে হয়তো পুরনো খবরের কাগজপত্র ঘাঁটলে কিছু তথ্য পাওয়া যেতে পারে।”

একটা আশার সূত্র ধরা পড়েছে মনে হল তাদের। দোকান থেকে বেরিয়ে তারা সোজা চলে গেলেন লাইব্রেরিতে। পুরনো খবরের কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে দিলেন। অবশেষে সোহিনীর চোখ আটকে গেল ১৯৯৫ সালের এক পুরনো খবরে। সেখানে ছিল অমলকান্ত রায়ের দার্জিলিংয়ের দালানটি অগ্নিকাণ্ডে জ্বলে যাওয়া হওয়ার খবর।

এই খবর পড়ে সোহিনী ও অর্জুনের মাথাটা ঘোলা হয়ে গেল। হোর্ডিংয়ে দেখা ছবিটি তো সেই পোড়া দালানের সামনে তোলা! তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব? আর কে তাদের এমন এক জায়গায় তোলা ছবি ব্যবহার করল, যা কয়েক দশক আগে পুড়ে গেছে? রহস্য আরও গভীর হল।

অগ্নিকাণ্ডের খবর পড়ে সোহিনী আর অর্জুনের মধ্যে এক অস্বস্তিকর চুপচাপ নেমে এল। হোর্ডিংয়ে দেখা ছবিটি যদি সত্যিই দার্জিলিংয়ের সেই পোড়া দালানের সামনে তোলা হয়, তাহলে তাদের সামনে দুটো সম্ভাবনা রয়েছে। এক – হয়তো এই ছবিটি অগ্নিকাণ্ডের আগে তোলা হয়েছিল। কিন্তু তাহলে কীভাবে এতো বছর পর এটি হঠাৎ করে হোর্ডিংয়ে এল? দুই – এটি কোনোভাবে এডিট করা ছবি হতে পারে। কিন্তু কে এমন কাজ করবে, আর কী উদ্দেশ্যে?

কৌতূহল আর সন্দেহ তাদের মনে তাণ্ডব করতে লাগল। লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে তারা আবার অমলকান্ত রায়ের পুরনো বাসস্থানের কাছে চলে গেলেন। সেখানকার নতুন অ্যাপার্টমেন্টের নিচে একজন নিরাপত্তা রক্ষীকে দেখে তারা তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেন। কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার পর রক্ষীটি জানালেন, এই জায়গায় নতুন ফ্ল্যাট কেনারা কয়েকজনই আছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন এক বিখ্যাত ফটোগ্রাফার, রাহুল সেন।

রাহুল সেনের নাম শুনে সোহিনী চমকে উঠল। সে জানত রাহুল একজন প্রতিভাবান ফটোগ্রাফার, যার কাজ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে সোহিনী বা অর্জুনের কোনো পরিচয় নেই। তাহলে রাহুল সেনের সঙ্গে এই রহস্যের কী সম্পর্ক থাকতে পারে?

সোহিনী অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করল, “আমরা কি রাহুল সেনের সঙ্গে দেখা করব?”

অর্জুন একটু ইতস্ততঃ করে বলল, “হতে পারে। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই যে সে এই ছবির সঙ্গে জড়িত।”

সোহিনী জানত অর্জুন ঠিক কথাই বলছে। কিন্তু তার অন্তরের কোথাও মনে হচ্ছিল রাহুল সেনের সঙ্গে দেখা করা জরুরি। হয়তো সে তাদের কিছু তথ্য দিতে পারবে।

অবশেষে তারা রাহুল সেনের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিল। তার ঠিকানা খুঁজে বের করে তার ফ্ল্যাটে গেল। দরজা খুললেন এক মৃদুস্বভাবের মধ্যবয়সী লোক। তিনিই রাহুল সেন। সোহিনী আর অর্জুন নিজেদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর তাদের রহস্যের কথা খুলে বললেন। হোর্ডিংয়ের ছবিটি দেখানোর পর রাহুলের চোখ দুটি চওড়া হয়ে গেল।

“এই ছবিটা…” রাহুল কিছু বলতে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল। ফোন নিয়ে কথা বলার পর তার চেহারায় একটা অস্বাভাবিক উত্তেজনা দেখা দিল।

ফোন রেখে রাহুল সেন গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন। চোখ দুটি সোহিনী আর অর্জুনের দিকে স্থির করে তিনি বললেন, “এই ছবিটা নিয়ে আপনাদের জানা সবকিছুই অবিশ্বাস্য লাগছে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এটা আমার তোলা ছবি নয়।”

সোহিনী অবাক হয়ে বললেন, “কিন্তু আমরা তো জানি, আপনি এখানে থাকেন। আর এই ছবিতে আমরা যে দালানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সেটাও এই বাড়ির জায়গায় ছিল।”

রাহুল মাথা নাড়লেন, “হ্যাঁ, ঠিক আছে। কিন্তু আমি এই ফ্ল্যাট কেনার সময় জানতাম না, এখানে আগে একটা পুরনো দালান ছিল। আর এই ছবির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”

অর্জুন কিছুটা সন্দিগ্ধ স্বরে বললেন, “কিন্তু তাহলে কে এই ছবিটা হোর্ডিংয়ে দিয়েছে? আর কী উদ্দেশ্যে?”

রাহুল চিন্তাভাবনা করে বললেন, “এই ফোনটা আমার মামার। তিনি জানালেন, কিছুদিন আগে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি তাকে ফোন করে এই ছবিটা পাঠিয়েছিলেন। সেই ব্যক্তি চেয়েছিলেন এই ছবিটা বিশাল হোর্ডিংয়ে প্রদর্শিত করতে। আর এই কাজের জন্য মোটা অঙ্কের টাকাও দিতে রাজি ছিলেন। আমার মামা এই ব্যবসাটা করতে চাইছিলেন না। কিন্তু অজ্ঞাত ব্যক্তি এত জোর করায়, অবশেষে রাজি হয়ে যান।”

এই নতুন তথ্যে আরও রহস্যের জাল জড়িয়ে গেল। কোন অজ্ঞাত ব্যক্তি এই ছবিটা ব্যবহার করে সোহিনী আর অর্জুনকে কেন এভাবে ধাঁধায় ফেলতে চাইল? আর কী তাদের অতীতের কোনো গোপন কথা এই ছবির সঙ্গে জড়িয়ে?

“আপনার মামার সঙ্গে কি দেখা করার কোনো ব্যবস্থা করা যায়?” জিজ্ঞাসা করল সোহিনী।

রাহুল একটু দ্বিধা করার পর বললেন, “হতে পারে। তবে তিনি বেশ বয়স্ক। আর এসব ঝামেলা নিয়ে তিনি খুব একটা আগ্রহী না।”

কিন্তু সোহিনী জানতেন, রাহুলের মামার সঙ্গে দেখা না করলে তাদের রহস্যের সমাধান পাওয়া যাবে না। তিনি রাহুলকে অনুরোধ করলেন, যেন তার মামার সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দেন। অনেকটা জোরাজুরির পর রাহুল রাজি হলেন।

কয়েকদিন পর তারা রাহুলের মামার সঙ্গে দেখা করলেন। তিনি বয়স্ক হলেও চোখে মুখে তেজ ছিল। সোহিনী আর অর্জুন তাকে সবকিছু খুলে বললেন। ছবিটি দেখিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, অজ্ঞাত ব্যক্তিটির কণ্ঠস্বর বা কোনো চেনা পরিচয় কি তিনি মনে রাখতে পারেন?

রাহুলের মামা ছবিটির দিকে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে থাকলেন। তার চোখের কোণে চিন্তার রেখা গাঢ় হল। একটু পরে তিনি বললেন, “কণ্ঠস্বরটা ঠিক মনে নেই। তবে, হ্যাঁ, একটা কথা মনে পড়ছে। সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি যখন ফোন করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘এই ছবিটা তাদের দেখানো দরকার, যাদের অতীত তাদের বর্তমানকে ডাকছে।'”

রাহুলের মামার কথা শুনে সোহিনী আর অর্জুন দুজনেই চুপ হয়ে গেলেন। “অতীত তাদের বর্তমানকে ডাকছে” – এই কথাগুলো তাদের মনে আবার জাগিয়ে দিল হোর্ডিংয়ের নিচে লেখা কথাগুলো। এই অদ্ভুত বাণীটি কি কোনো ইঙ্গিত বহন করে? আর ঠিক কীভাবে তাদের অতীত তাদের বর্তমান জীবনকে প্রভাবিত করছে?

এই নতুন তথ্য তাদের আরও বিভ্রান্ত করল। কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট হল, এই অজ্ঞাত ব্যক্তি তাদের চেনেন। সে জানে তাদের অতীতের কোনো গোপন কথা, যা হয়তো তাদের ভুলিয়ে রাখা হয়েছে।

রাহুলের মামার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হল সোহিনী আর অর্জুন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তারা দুজনেই চুপচাপ। অর্জুন কিছুক্ষণ পরে বলল, “এই রহস্যের জাল আরও জটিল হয়ে উঠল। কিন্তু আমি হার মানতে রাজি নেই।”

সোহিনী তার কথা শুনে একমত হল। সে জানত, এই রহস্যের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না।

“চলো, আমার বাবা-মার সঙ্গে আবার দেখা করি।” বলল সোহিনী। “হয়তো ছোটবেলার সেই দার্জিলিং যাত্রার সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য তারা মনে করতে পারবেন।”

অর্জুন সোহিনীর পরিকল্পনাকে সমর্থন করল। তারা আবার সোহিনীর বাবা-মার কাছে গেল। এবার সোহিনী তার ছোটবেলার সেই স্মৃতির কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করল। সে বালকনিতে দাঁড়িয়ে দূরে একটা অদ্ভুত দালান দেখেছিল বলে মনে করতে পারছে।

সোহিনীর কথা শুনে সুব্রত চিন্তায় পড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর তিনি বললেন, “একটা কথা মনে পড়ছে। সেই সময় আমরা দার্জিলিং ঘুরতে গিয়ে একটা জাদুঘরে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রাচীন শিল্পকলা আর নিদর্শন দেখানো হত।”

একটা আশার সূত্র দেখে মনে হল সোহিনী আর অর্জুনের। “হতে পারে, সেই জাদুঘরের কাছাকাছিই ঐ দালানটি ছিল।” বলল সোহিনী।

“ঠিক আছে, তাহলে কাল সকালেই দার্জিলিং যাব।” সিদ্ধান্ত নিলেন সুব্রত।

পরের দিন সকালে তারা সবাই মিলে দার্জিলিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হল। পাহাড়ের ঘুঁটঘুঁটে রাস্তা ধরে দার্জিলিং পৌঁছালেই সোহিনী সোজা সেই জাদুঘরে গেল। জাদুঘরের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কয়েক বছর আগে জাদুঘরের সংস্কার হয়েছে। সেই সময় জাদুঘরের আশেপাশের জমিও নতুন করে সাজানো হয়। আর ঠিক সেই সময়ই একটি পুরনো, জীর্ণ দালান ভেঙে ফেলা হয়।

এই তথ্যে সোহিনী আর অর্জুনের ধারণা পাকাপোক্ত হল যে, হোর্ডিংয়ে দেখা ছবিটি সেই ভাঙা দালানের সামনেই তোলা হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হল, তাদের ছবি সেখানে কীভাবে গেল?

জাদুঘরের পর তারা সোহিনীর বাবার স্মৃতির সাহায্য নিয়ে সেই এলাকা খুঁজতে বের হল। ঘন্টার পর ঘণ্টা ঘুরে বেড়ানোর পর তারা একটি বয়স্ক মহিলাকে দেখতে পেলেন। মহিলাটি ঐ এলাকারই বাসিন্দা ছিলেন এবং অনেকটা চিন্তায় ডুবে থাকা মনে হল। সোহিনীরা তার কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন, কয়েক বছর আগে এই এলাকায় কোনো পুরনো দালান ছিল কিনা।

মহিলাটি তাদের কথা শুনে একটু অবাক হলেন। তারপর বললেন, “হ্যাঁ, ঠিক আছে। এই ঠিক যে জায়গাটা, এখানেই ছিল একটা পুরনো বাড়ি। সেটা শিল্পীদের থাকার জায়গা ছিল, কিন্তু কয়েক বছর আগে জমি নিয়ে ঝামেলার কারণে বাড়িটা ভেঙে ফেলা হয়।”

এরপর মহিলাটি আরও চমকপ্রদ কিছু বললেন। তিনি জানালেন, সেই বাড়ির শেষ শিল্পী বাসিন্দা ছিলেন এক বিধবা রম্যা সেন। রম্যার কোনো সন্তান ছিল না, তবে মাঝে মাঝে একটা ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাড়িতে আসতেন।

এই নাম শুনে সোহিনী হতভম্ব হয়ে গেল। রম্যা সেন? আর ছেলেমেয়ে? অর্জুনের দিকে চোখ ফেলে সে ইশারা করল। তারা দুজনেই সন্দেহ করতে শুরু করল, এই রম্যা সেন কি কোনোভাবে তাদের অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে?

মহিলাটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোহিনী আর অর্জুন সোজা লাইব্রেরিতে গেল। সেখানে পুরনো খবরের কাগজপত্র ঘাঁটতে শুরু করল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোঁজার পর অবশেষে তারা একটা খবরের কাটিং পেল। সেখানে ছিল রম্যা সেনের ছবি। আর নিচে লেখা ছিল – “অচেনা শিল্পী – রহস্যজনক মৃত্যু”।

রম্যা সেনের ছবি দেখে সোহিনী চমকে উঠল। ছবিতে থাকা মহিলার সঙ্গে তার মায়ের অদ্ভুত সদৃশতা আছে। আরও পড়তে থাকল সে। খবরে ইতস্তত লেখা ছিল, রম্যা সেন একজন প্রতিভাবান শিল্পী ছিলেন। তবে তার মৃত্যু নিয়ে রহস্য রয়ে গেল। খবরে বলা হয়েছিল, রম্যা সেনের শিল্পকলা অদ্ভুত ও রহস্যময় ছিল। তার আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে অনেকগুলোতেই হারিয়ে যাওয়া বা অজানা স্থানের দৃশ্য থাকত। পুলিশের তদন্তে কোনো ফলাফল না মেলায় রম্যার মৃত্যু একটি রহস্য হিসেবেই থেকে গেল।

এই খবর পড়ে সোহিনী আর অর্জুনের মাথা ঘুরে গেল। রম্যা সেনের রহস্যময় মৃত্যু, তার অদ্ভুত শিল্পকলা, আর সোহিনীর মায়ের সঙ্গে মিল – সবকিছুই যেন কোনো একটা পাজলের টুকরো হয়ে হঠাৎ করে জুড়ে দাঁড়াল।

সোহিনী জিজ্ঞাসা করল, “আমার কি মনে হয়, রম্যা সেনই আমার আসল মা?”

অর্জুন চুপ করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর সে বলল, “সম্ভবনাটা আছে। কিন্তু তাহলে কীভাবে আমাদের ছবি সেই দালানের সামনে তোলা হল? আর কে আমাদের এই রহস্যের জালে ফেলল?”

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তারা আবার দোকানে গেলেন। দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করলেন রম্যা সেন সম্পর্কে। কিন্তু দোকানদার জানালেন, রম্যা সম্পর্কে তিনি খুব বেশি কিছু জানেন না। তবে মনে পড়ে, রম্যা মাঝে মাঝে ছবি আঁকতে আসতেন। আর একবার এক জোড় ছেলেমেয়ের ছবি আঁকতে দিয়েছিলেন।

এই কথা শুনে সোহিনী আর অর্জুনের আর সন্দেহ রইল না। সেই ছেলেমেয়ে ছিল তারাই। কিন্তু কেন রম্যা তাদের ছবি আঁকলেন? আর তারপর তাদের জীবন থেকে হঠাৎ করে কোথায় নিখোঁজ হলেন?

এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, পুলিশের সাহায্য নেবেন। পুলিশকে রম্যা সেনের রহস্যময় মৃত্যু এবং তাদের ছবির কথা জানালেন। পুলিশ, রম্যার পুরনো বাড়ির জায়গা খানাতল্লাশি করার পর একটা লকার পেল। লকার খুললে তারা চমকে উঠল।

লকারের ভিতরে ছিল রম্যার অসংখ্য অদ্ভুত আঁকা ছবি। আর সঙ্গে ছিল সোহিনী আর অর্জুনের ছোটবেলার একটি ডায়েরি।

ডায়েরিটি পড়তে শুরু করল সোহিনী। প্রথম পাতায় লেখা ছিল, “আমার দুই সন্তান, সোহিনী আর অর্জুন।” সোহিনী অবিশ্বাসের চোখে তাকাল অর্জুনের দিকে।

ডায়েরিতে রম্যা লিখেছিলেন, সে একজন গুপ্তচর ছিলেন। এবং তার শিল্পকলার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লুকিয়ে রাখতেন। কিন্তু একবার তার শত্রুরা তার এই গোপন কথা জেনে ফেলে। তারা রম্যা এবং তার স্বামীকে খুন করে। কিন্তু সোহিনী আর অর্জুনকে বাঁচানোর দায়িত্ব রম্যার এক বিশ্বস্ত সহকর্মীকে দেওয়া হয়। সেই সহকর্মীই ছোটবেলায় সোহিনী আর অর্জুনকে দার্জিলিং নিয়ে যান এবং রম্যার আঁকা ছবিতে তাদের লুকিয়ে রাখেন।

ডায়েরিতে রম্যা আরও লিখেছিলেন, যখন তার সন্তানরা বড় হবে এবং এই ছবি দেখতে পাবে, তখনই তারা তাদের আসল পরিচয় জানতে পারবে। সাথী নামের সেই সহকর্মী রম্যার লকারে ডায়েরি ও ছবিগুলো রেখে দেন, যাতে কোনোদিন সোহিনী আর অর্জুন সত্যিটা জানতে পারে।

পুলিশের সাহায্যে সোহিনী আর অর্জুন রম্যার সহকর্মী ‘সাথী’কে খুঁজে বের করল। সাথী তাদের সব কিছু খুলে বললেন। রম্যার শত্রুরা এখনও ধরা না পড়লেও, তিনি সোহিনী আর অর্জুনকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করবেন, সেই প্রতিশ্রুতি দিলেন।

রহস্যের সমাধান হয়ে গেলেও, সোহিনী আর অর্জুনের মনের মধ্যে এক অস্বস্তি থেকে গেল। তারা তাদের পালনকর্তা কে ভুল বুঝতে পারে না। কিন্তু রম্যার রক্তের টানও তাদের কাছে অস্বীকার করার মতো নয়।

অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত নিল, তারা তাদের দুই পরিবারের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখবে। সোহিনী আর অর্জুন জানত, এটা সহজ হবে না। কিন্তু রহস্য ও দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে তারা তাদের নতুন পরিচয় ও অতীতের সঙ্গে খাপ খাওয়া শিখবে। হোর্ডিংয়ের ছবিটি যেন তাদের অতীতের ডাক ছিল, আর এখন তাদের হাতে ছিল সেই ডাকের উত্তর।

এই রকম চিত্তাকর্ষক বাংলা ছোট গল্প -এর আপডেট পেতে আমাদের WhatsApp চ্যানেল জয়েন করুন।

নতুন বাংলা ছোট গল্প

প্রতিদ্বন্দ্বী

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: প্রতিদ্বন্দ্বী

শেষ জমিদারের মেয়ে

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: শেষ জমিদারের মেয়ে

স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

শিউলি, এক গ্রামের মেয়ে, তার অসাধারণ গানের প্রতিভা দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করে। কিন্তু খ্যাতির পথে তাকে অতিক্রম করতে হয় অনেক বাধা। এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পে দেখুন কীভাবে সে তার স্বপ্ন পূরণ করে এবং সকলের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

Leave a Comment

অনুলিপি নিষিদ্ধ!