শিকড়ের ডাক

কোলকাতার পুরনো বাড়িটা। সন্ধ্যের পর কেমন যেন একটা শীতল, মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসত, অনেকটা শিউলি ফুলের মতো। বাবা বলতেন, "দাদুভাই, ওটা তোর ঠাকুমার গন্ধ, জানিস?" আমি জানতাম, ঠাকুমা নেই, কিন্তু তাঁর সুবাসটা রোজ রাতে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত।

এক রাতে ঘুমের মধ্যে মনে হলো, কেউ যেন আমার নাম ধরে ডাকছে—খুব আস্তে, করুন স্বরে। আওয়াজটা বাড়ির পেছনের মরা তুলসী গাছটা থেকে আসছে। গাছটা নাকি ঠাকুমার হাতে লাগানো ছিল। আমার বুক কেঁপে উঠলো, চোখ খুলতেই দেখলাম...

...দরজার কাছে একটা ছায়া! ছায়াটার কাঁধে একটা পুরনো চাদর, ঠিক ঠাকুমার চাদরের মতো। সেটা থেকে সেই একই শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ। আমার হাত-পা যেন ভারী হয়ে আসছিল, আমি চিৎকার করতে পারছিলাম না।

ছায়াটা ধীরে ধীরে সরে গেল রান্নাঘরের দিকে, যেখান থেকে ঠাকুমার হাতের পায়েস রান্নার শব্দ আসত। আমার মনে হলো, ঠাকুমা কি এখনও আমাদের জন্য অপেক্ষা করেন? তাঁর আত্মা কি সত্যিই মুক্তি পায়নি? আমি বিছানা থেকে নামলাম।

পেছনে রান্নাঘরের দিকে যেতেই দেখি, মেঝেতে পায়েসের একটা বাটি রাখা! গরম ধোঁয়া উঠছে, আর বাটির পাশে একটা শুকনো শিউলি ফুল। কেউ তো রান্নাঘরে নেই, তাহলে এটা কে রাখল? ভয়ে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।

হঠাৎ অনুভব করলাম, আমার কাঁধের ওপর একটা নরম হাতের স্পর্শ। সেটা ঠাকুমার হাতের মতোই শান্ত আর স্নেহময়। কানে ফিসফিস করে আওয়াজ এলো, "খেয়ে নে দাদুভাই, আমার বানানো পায়েস!" আমি কি ভুল শুনছি?

পেছন ফিরে কাউকে দেখিনি, কিন্তু পায়েসের সেই বাটিটা তখনও আমার সামনে। ভয়ে নয়, বরং এক অজানা স্নেহ আর ভালোবাসার টানে আমি বাটিটা হাতে নিলাম। আমি জানি, ঠাকুমা এখনও এই বাড়িতেই আছেন, কারণ শিকড়ের টান সহজে ফুরোয় না।

জোনাকি রাতের পুতুল রহস্য