ভাঙা স্বপ্নের জয়

ভোরের ট্রেনে বসে রাহুল জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। কুয়াশার ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল গ্রাম, ক্ষেত, ভাঙা স্টেশন। পকেটে শেষ কয়েকটা মুদ্রা, মনে ভাঙা স্বপ্ন—আজকের দিনটা সব বদলাতে পারে কি? শহরে তার অপেক্ষায় অচেনা ভবিষ্যৎ।

গত বছর চাকরি হারিয়ে বাড়ির চুপচাপ উঠোনে সে প্রতিদিন হেঁটেছে। মায়ের চোখে লুকোনো দুশ্চিন্তা, বাবার নীরবতা, পাড়ার ফিসফাস—সব মিলিয়ে রাহুল ভেবেছিল, তার লড়াই কি এখানেই শেষ? তবু ভেতরে জ্বলছিল ক্ষীণ আগুন। কেউ দেখেনি। একটুও।

আজ ইন্টারভিউ। শহরের উঁচু কাঁচের ভবন, ভেতরে ঠান্ডা আলো। ফর্মে নাম লিখতে লিখতে হাত কাঁপে, গলা শুকিয়ে যায়। ঠিক তখনই পকেট থেকে মায়ের ভাঁজ করা চিঠিটা বেরিয়ে আসে—কী লেখা ছিল? হৃদয় ধুকপুক করে। সময় থেমে যায়।

চিঠিতে বড় কথা নেই। আছে বিশ্বাস, শ্রম, আর অপেক্ষা। ‘হার মানিস না’—এই এক লাইন পড়ে বুক ভরে ওঠে। বাইরে বৃষ্টি নামে, কাচে বিন্দু জমে। রাহুল বুঝতে পারে, পরীক্ষা আসলে শুরু হলো এখনই—পারবে তো? নিজেকে ছাড়িয়ে।

ভিতরে ডাকা হয়। প্রশ্ন আসে কঠিন, সময় কম। রাহুল নিঃশ্বাস গোনে, চোখ বন্ধ করে উত্তর দেয় নিজের মতো। ভুল হয়, তবু সে থামে না। ঘরের নীরবতা ভারী—এই সাহসটাই কি পার্থক্য গড়বে? ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে।

বেরিয়ে এসে ফোন বাজে। এক মুহূর্তে মনে পড়ে গ্রাম, উঠোন, ট্রেনের কুয়াশা। স্ক্রিনে অচেনা নম্বর। রাহুল থামে, তারপর ধরে। ওপাশে ক্ষণিক নীরবতা—খবরটা কি সুখের? হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় দ্রুত। চারপাশ ঝাপসা লাগে। শ্বাস আটকে আসে।

হাসি ভেঙে বেরোয়। চাকরিটা তার। রাহুল আকাশের দিকে তাকায়, বৃষ্টিভেজা রাস্তায় আলো ঝিলমিল। সে জানে, জয়টা আজকের নয়—এই সাহসটাই তাকে বারবার জেতাবে। আগামীকাল কেমন হবে? নতুন ভোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। মন শান্ত, চোখ উজ্জ্বল। আজ।

নীরব সত্য