কলকাতার বৃষ্টিভেজা রাতে পুরোনো ট্রামের শব্দ থেমে গেলে অরুণ ফোন পায়—অজানা নম্বর। কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে বলে, ‘আজ তুমি বাড়ি ফিরবে না।’ জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্বে ভয় জমে ওঠে। দূরে পুলিশের সাইরেন, কাছেই নিঃশ্বাসের শব্দ।
পরদিন সকালে গঙ্গার ঘাটে একটি জুতো ভেসে ওঠে। সংবাদে নাম নেই, মুখ ঝাপসা। অরুণ চিনে ফেলে—এটা তার বাবার। স্মৃতির ভিড়ে রাতের কণ্ঠস্বর আবার ডাকে, উত্তর দাবি করে। চারপাশে কাকের ডাক, ভেজা ধূপের গন্ধ ছড়ায়।
তদন্ত শুরু হলে বোঝা যায়, বাবা শেষবার দেখা গিয়েছিল পুরোনো মিলের কাছে। অরুণ সেখানে যায়; দেয়ালে লাল রঙে আঁকা তীর, ভাঙা ঘড়ি, আর সময় থেমে থাকার ইঙ্গিত। পায়ের তলায় কাঁচ কড়কড়ায়। আলো নিভে আসে, ছায়া বাড়ে।
মিলের ভেতরে ক্যাসেট প্লেয়ার চালু হয়। বাবার কণ্ঠ: ক্ষমা চাওয়ার গল্প, অসম্পূর্ণ স্বীকারোক্তি। অরুণ বুঝতে পারে, এই খেলায় সে একা নয়। অন্ধকারে কেউ শ্বাস টানে, খুব কাছে। লোহার দরজা বন্ধ হয় ধপাস। হৃদস্পন্দন বাড়ে।
পালানোর পথে অরুণ খুঁজে পায় নথি—জমি দখলের চুক্তি, মিলের আগুন, বাবার সই। সত্য কাঁটার মতো বিঁধে। ফোন আবার বেজে ওঠে; কণ্ঠ বলে, ‘শেষটা বেছে নাও।’ বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে আগুন। পথ দুটো অন্ধকার। নীরব। ভয়ানক।
অরুণ পুলিশের কাছে যায়, নথি দেয়। মিল ঘিরে ফেলে আলো। ধরা পড়ে মাস্টারমাইন্ড—চাচা। কিন্তু বাবার খোঁজ নেই। সাইরেন থামলে অরুণ বুঝে যায়, গল্প এখনো বাকি। রাতে নদীর দিক থেকে আলো টলে। নৌকার ছায়া। দূরে।
ভোরে গঙ্গার কুয়াশায় একটি মানুষ হেঁটে আসে—বাবা। চোখে অপরাধ, হাতে ক্ষমার চিঠি। অরুণ পড়ে না। সে কাগজটা জলে ছুড়ে দেয়, আর বলে, ‘আজ থেকে সত্যই আমার ঘর।’ সূর্য উঠছে, তবু ঠান্ডা। নীরবতা ভারী। চিরকাল।