সন্ধ্যা নামছে। পুরুলিয়ার লাল মাটির পথ ধরে হাঁটে ছোট্ট সুনীল। তার কাঁধে বাবার ভাঙা হারমোনিয়ামের বাক্স। পেটে খিদে, মনে এক আকাশ গান। চারপাশে শুধু দারিদ্র্যের দীর্ঘশ্বাস। সে কি পারবে এই আঁধার কাটিয়ে নিজের সুরকে সবার কাছে পৌঁছাতে?
গ্রামের মেলায় ভিড়। সাহস করে সে মঞ্চের এক কোণে দাঁড়ায়। প্রদীপের আলোয় তার মুখ দেখা যায় না, শুধু দেখা যায় তার চোখজোড়া। হঠাৎ হারমোনিয়ামের বুক চিরে ভেসে আসে এক করুণ রাগ। সকলে থমকে যায়। সুরের এমন যাদু এর আগে কেউ কি শুনেছে?
প্রথম দিন উপহাস জুটেছিল, “এসব গান গেয়ে কি আর পেট ভরে?” তবুও সুনীল থামেনি। দিনের বেলা সে মজুরের কাজ করে, আর রাতে পুরনো কুঁড়েঘরে গানের সাধনা। প্রতিটি ব্যর্থতা তার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে। তার সেই সুরের আগুন কি একদিন আলো হয়ে জ্বলবে?
একদিন কলকাতার এক নামী সঙ্গীত পরিচালক সেই গ্রামে আসেন। উদ্দেশ্য, নতুন প্রতিভা খোঁজা। সুনীলের গান শুনে তাঁর চোখ ভিজে যায়। এই প্রতিভার স্ফুলিঙ্গকে তিনি শুধু মঞ্চে নয়, সারা পৃথিবীর সামনে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সুনীল কি তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করবে?
সুনীল দ্বিধায় ভোগে। শহরে গেলে হয়তো রোজগার হবে, কিন্তু গ্রামের মাটি আর তার হারানো সুরের সরলতা কি সে ভুলে যাবে না? মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে শেষমেশ সিদ্ধান্ত নেয়। তার হাতে তুলে নেয় একটি নতুন হারমোনিয়াম, যা তার স্বপ্ন দেখার সাহস যোগায়।
কয়েক বছর পর। রেডিওতে ভেসে আসছে চেনা কণ্ঠস্বর, "আমার সোনার বাংলা..."। সারা দেশের মানুষ মুগ্ধ। স্টেডিয়ামে সুনীলের অনুষ্ঠান। হাজার হাজার হাততালি। মঞ্চের আলোয় ঝলমল করছে সেই ছেলেটি, যার পেটে একসময় দিনের পর দিন খিদে থাকত।
সুনীল আজ ভারতের গর্ব। কিন্তু আজও তার প্রতিটি গানে মেশানো থাকে পুরুলিয়ার লাল মাটির ঘ্রাণ, সেই অভাবের সুর। সে প্রমাণ করলো, প্রতিভা আর পরিশ্রমের কাছে কোনো বাধাই চিরস্থায়ী নয়। তোমার ভিতরের সেই লুকানো তারাটিকে তুমি কবে আলো দেখাবে?