জলের প্রদীপ

গ্রামের শেষ প্রান্তে, শালগাছ ঘেরা ছোট্ট মাটির ঘরে থাকত টুনু। বর্ষার রাতে বাতাসে কাঁপত জানালার কাগজ। সেদিন ঘুমোতে যাওয়ার আগে সে শুনল, পুকুর দিক থেকে কে যেন ফিসফিস করে তার নাম ডাকছে…

টুনু জানালা খুলে দেখে, চাঁদের আলোয় পুকুর জল রুপোর মতো ঝিলমিল। হঠাৎ জলের উপর ভাসতে থাকা একটি প্রদীপ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে। প্রদীপের ভিতর থেকে ভেসে আসে এক দুঃখী শিশুর কান্না…

ভয় পেলেও টুনুর বুকের ভেতর কেমন মায়া জাগে। সে চুপিচুপি খালি পায়ে পুকুরঘাটে যায়। জল তখন স্থির, কিন্তু তার হৃদয় ধকধক করছে। প্রদীপটা হঠাৎ নিভে যায়, আর চারপাশ অদ্ভুত নীরবতায় ভরে ওঠে…

নীরবতার মাঝেই শোনা যায় কাঁপা স্বর—“আমি পথ হারিয়েছি।” জলের ধারে বসে থাকা এক ছায়ামূর্তি ধীরে মাথা তোলে। টুনু বুঝতে পারে, ভয় নয়, এই মুহূর্তে কারও সাহায্যই সবচেয়ে জরুরি…

টুনু নিজের লণ্ঠন এগিয়ে ধরে। আলোয় দেখা যায়, সে এক জলপরী শিশু, চোখে জমে থাকা অভিমান। সে বলে, বাড়ির পথ ভুলে গেছে বহুদিন। টুনুর মনে পড়ে দাদুর বলা পুরোনো গল্পের কথা…

দাদু বলতেন, সত্যিকারের সাহস মানে সাহায্যের হাত বাড়ানো। টুনু জলপরীর হাত ধরে মন্ত্র পড়ে। পুকুরের জল ঘুরে দাঁড়ায় পথের মতো। আলো আর জলে মিশে তৈরি হয় এক জাদুর সিঁড়ি…

জলপরী হাসতে হাসতে বিদায় নেয়, আকাশে ফুটে ওঠে নতুন তারা। টুনু ফিরে দেখে, রাত শান্ত, ঘর উষ্ণ। সে বুঝতে পারে, সাহস আর দয়ার আলো থাকলে অন্ধকারও বন্ধু হয়ে যায়—এই ভাবনাতেই তার চোখ বুজে আসে…

প্ল্যাটফর্মের নীরবতা