অমাবস্যার আত্মা

গভীর রাতে, গ্রামের প্রান্তে পুরনো বটগাছটা যেন ফিসফিস করছিল। শীতল বাতাস বইছিল, পাতারা কাঁপছিল রহস্যময় সুরে। পূর্ণিমা চাঁদ মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছিল, লম্বা ছায়া ফেলছিল পথে। আজ অমাবস্যার তিথি, আর গ্রামের বুড়োরা বলছিল আজ নাকি এক অভিশপ্ত আত্মা জেগে ওঠে। কেমন যেন একটা দমবন্ধ করা নীরবতা চারদিকে।

শিউলি নামের মেয়েটি একা পুকুরে জল আনতে যাচ্ছিল। বাঁধানো ঘাটে তার পায়ের শব্দও যেন ভয় ধরাচ্ছিল। হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে একটা চাপা গোঙানির আওয়াজ ভেসে এল। শিউলির বুক ধড়াস করে উঠল। সে কি ভুল শুনল? নাকি সত্যিই কেউ কাঁদছে অন্ধকারে? তার মনে অজানা এক ভয় বাসা বাঁধতে শুরু করল।

কাছে গিয়ে শিউলি দেখল, ঘাটের পাশে একটি পুরোনো, ভাঙা থালা পড়ে আছে। তাতে সিঁদুরের ছোপ আর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। থালাটা যেন ফিসফিস করে তার কানে অতীতের কোনো ভয়ংকর কাহিনি सुनाচ্ছে। শিউলির হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। এই থালার রহস্য কি? কেন এত অশুভ ইঙ্গিত?

হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন তার নাম ধরে ডাকল— "শিউলি..."। কণ্ঠস্বরটা ভারী আর ঠান্ডা, যেন বহু যুগ আগের কোনো কবরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে। শিউলি ভয়ে জমে গেল, মুখ ঘুরিয়ে তাকাতে সাহস পেল না। কে ডাকছে তাকে এমন রাতে, এমন ভয়ংকর পরিবেশে?

ধীরে ধীরে শিউলি পিছন ফিরে তাকাল। আবছা আলোয় সে দেখল, এক দীর্ঘ, ছায়াময় মূর্তি বটগাছের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। তার পা মাটিতে পড়ছে না, মনে হচ্ছে যেন ভেসে বেড়াচ্ছে। মূর্তিটির হাতে সেই ভাঙা থালাটা। শিউলির গলা শুকিয়ে কাঠ। এ কি সেই অভিশপ্ত আত্মা?

ভয়ে চিৎকার করতেও পারল না শিউলি। তার মনে হল, মূর্তিটা যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে, তার চোখের গভীরে এক সীমাহীন অন্ধকার। মূর্তিটি থালাটা উঁচু করে ধরল, আর অমনি চারপাশ ধোঁয়ায় ঢেকে গেল। শিউলি জ্ঞান হারাল, পড়ে গেল ঘাটের পাথরের উপর।

সকালে গ্রামের লোকেরা শিউলিকে অজ্ঞান অবস্থায় খুঁজে পেল। ভাঙা থালাটা তখনও তার পাশে পড়ে ছিল, তবে তাতে রক্তের দাগ আর ছিল না। বুড়োরা বলল, অভিশাপ সত্য হয়েছে। কিন্তু শিউলির মনে সেই রাতের ছায়াময় মূর্তি আর ঠান্ডা কণ্ঠস্বর আজও ঘুরে বেড়ায়। সেই আত্মা কি আবার ফিরে আসবে?

পরীর বাঁশি