শীতল সন্ধ্যায় গ্রামবাংলার পুরোনো ডাকবাংলোতে চাকরি নিতে আসে অর্ণব। কেয়ারটেকার বলে, রাত বারোটার পর তৃতীয় ঘরের দরজা খুলবে না। দেয়ালের ভেজা দাগগুলো যেন ফিসফিস করে তার নাম ডাকে। বুকের ভিতর অকারণ ভয়ের ঢেউ উঠতে থাকে।
প্রথম রাতেই বিদ্যুৎ চলে যায়। কুয়াশায় ঢাকা বারান্দা পেরিয়ে অর্ণব শুনতে পায় পায়ের শব্দ। ঘড়িতে ঠিক বারোটা বাজে, আর তৃতীয় ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে আসে। তার শ্বাস আটকে আসে অজানা আশঙ্কায়।
সাহস সঞ্চয় করে সে দরজার কাছে যায়। ভেতর থেকে ভেসে আসে মন্দিরের ঘণ্টার মতো শব্দ। চোখে পড়ে পুরোনো আলপনায় ঢাকা মেঝে, আর রক্তে লেখা একটি নাম—অর্ণব। হৃদপিণ্ড দাপাতে থাকে ভয়ের তালে। ঘাম ঝরে কপাল বেয়ে।
হঠাৎ পেছনে কণ্ঠস্বর, কেয়ারটেকারের। সে বলে, এই বাংলো আগুনে পুড়ে গিয়েছিল ত্রিশ বছর আগে। যে যুবক মারা যায়, তার নামও ছিল অর্ণব, ভুল করে আটকে পড়েছিল এখানে। তার আত্মা আজও পথ চায়। রাত নামল আরও ঘন।
অর্ণব পালাতে চায়, কিন্তু দরজা-জানালা মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। দেয়ালে ভেসে ওঠে আগুনের ছায়া, পোড়া চুলের গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কেউ যেন ফিসফিস করে বলে, থেকে যাও। পায়ের তলা জমে যায় ঠান্ডায়। চোখে অশ্রু জমে।
ভোরের আলো ফুটতেই গ্রামবাসী বাংলোয় ঢুকে দেখে নতুন একটি নাম ফলকে। কেয়ারটেকার নেই কোথাও। খাতায় লেখা, আজ থেকে ডাকবাংলোর রাত্রিকালীন প্রহরী—অর্ণব। মেঝেতে ছাই আর পোড়া ঘড়ি পড়ে থাকে। ঘড়ির কাঁটা আটকে বারোটায়। হাওয়ায় কান্না মেশে।
সন্ধ্যা নামলে দূর থেকে আলো জ্বলে ওঠে বাংলোয়। পথিকেরা বলে, জানালায় এক যুবক দাঁড়িয়ে থাকে, আগুনে পোড়া চোখে অপেক্ষা। সে সাবধান করে—রাত বারোটার পর তৃতীয় ঘরে যেও না। কেউ শোনে না সতর্কতা। অন্ধকার আবার নামছে ধীরে।