নিশীথের নির্বাসনে অভিষেকের রহস্যময় অভিজ্ঞতা। রহস্য, রোমাঞ্চ, আর ভয়ের এক অসাধারণ মিশ্রণ। কী ঘটবে যখন অভিষেক নিশীথের নির্বাসনের রহস্য উন্মোচন করতে চেষ্টা করবে?

নিশীথের নির্বাসন

নিশীথের নির্বাসনে অভিষেকের রহস্যময় অভিজ্ঞতা। রহস্য, রোমাঞ্চ, আর ভয়ের এক অসাধারণ মিশ্রণ। কী ঘটবে যখন অভিষেক নিশীথের নির্বাসনের রহস্য উন্মোচন করতে চেষ্টা করবে?

কলকাতার বুকে ঢাকা পড়ে থাকা এক গলির গল্প, যেখানে অতীতের ছায়া আর বর্তমানের রহস্য জড়িয়ে মৃত্যুর নাচ চলতে থাকে। রাতের নীল শাড়ির কোলে কুঁজো হয়ে বসে আছে সেই গলি – ‘নিশীথের নির্বাসন’। সেখানেই থাকে সোনা দাস, একাকী, বৃদ্ধা মহিলা, যার চোখে সর্বক্ষণের ভয় আর অস্থিরতা। কেউ জানে না কী এমন রহস্য লুকিয়ে আছে তার অতীতে, যা তাকে এই নিঃসঙ্গ জীবনে ঠেলে দিয়েছে

এক ঝড়ের রাতে, সোনার কাছে ফিরে আসে তার নাতি, অভিজিৎ। বছরের পর বছর কোথায় ছিল সে, কী করছিল, কিছুই জানা নেই। ঘরে ঢোকার সঙ্গে সোনার চোখে এক অস্বাভাবিক চমক। যেন কোনও ভয়ঙ্কর দৃশ্য তার সামনে ফুটে উঠেছে। অভিজিৎ ছেলেবেলা থেকেই একটু বিচ্ছিন্ন স্বভাবের ছিল। কিন্তু এবার তার চোখে এক অশুভ ঔজ্জ্বল্য, যা সোনাকে আরও উদ্বিগ্ন করে তোলে।

দিন যত এগিয়ে যায়, ততই অদ্ভুত ঘটনার ঝড় উঠতে থাকে নিশীথের নির্বাসনে। রাতের অন্ধকারে কানে আসে অস্পষ্ট ফিসফাস। ঘরের কোণে হঠাৎ করে দেখা দেয় অজানা ছায়া। পুরনো আলনার আলোয় নাচতে থাকে অদ্ভুত আলোকচ্ছটা। সোনা কারও সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে, কিন্তু কাউকে দেখা যায় না। অভিজিৎ এসব ঘটনাকে এড়িয়ে চলে, যেন সে জানে এই সবের আসল কথা।

এক রাতে, সোনা অভিজিতকে জিজ্ঞাসা করে, “কী চাই তোর নিশীথের নির্বাসনে?” অভিজিতের কণ্ঠস্বর শীতল সাপের ফিসফাসের মতো, “আমার জিনিসটা ফিরিয়ে দাও, ফিরিয়ে দাও না-হলে…” কথাটা শেষ না করেই সে হাওয়ার মতো নিখোঁজ হয়ে যায়। সোনা আরও ভেঙে পড়ে। সে জানে, নিশীথের নির্বাসনের সাথে জড়িয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর অতীত – তার স্বামী সূর্য, এক প্রতিভাবান রতনশিল্পী, যার নিখোঁজ হওয়ার রহস্য আজও অমীমাংসিত।

অভিজিতের কথায় একটা দ্বিধা জাগে অভিষেকে। সে জানতে চায় কী জিনিসের কথা বলছে অভিজিৎ। সোনা, কাঁপা কণ্ঠে, খুলে বলে নিশীথের নির্বাসনের গল্প। কীভাবে সূর্য হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়, কীভাবে পুলিশ কোনও সূত্রই পায়নি। কিন্তু সোনা জানত, সূর্য কোনওদিন তাকে ছেড়ে যেতে পারে না। সে বিশ্বাস করতো, সূর্য কোনও এক অলৌকিক কারণে আটকে পড়েছে।

অভিষেক জানতে পারে, সূর্য একটি মূল্যবান রত্নখচিত সাপের মূর্তি খোঁজার চেষ্টা করছিল, ঠিক নিশীথের নির্বাসনের পাশেই। কিংবদন্তি ছিল, সেই মূর্তিতে কোটিপতি হওয়ার মন্ত্র লুকিয়ে আছে। কিন্তু খোঁড়ার কাজ শেষ করার আগেই সূর্য নিখোঁজ হয়ে যায়। এখন বুঝতে পারছে সোনা, কেন অভিজিৎ ফিরে এসেছে। সেই মূর্তি তার হাতে চাই। কিন্তু সমস্যা হল, সোনা জানে না কোথায় সেই মূর্তি লুকিয়ে আছে।

অভিষেক সোনাকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা দু’জনে মিলে বাড়ির প্রতিটি কোণ খুঁজে বেড়ায়। পুরনো আলনার আলোয় ঘরের দেওয়ালে পড়া ছায়াগুলো যেন তাদেরকে উপহাস করছে। হঠাৎ অভিষেকের নজর পড়ে একটা পুরনো আলমারির ওপর। সেখানে ঝুলছে একটা বাঁশের ঝুড়ি। সোনা মনে করতে পারে না, কখনও সেই ঝুড়ি সেখানে দেখেছে।

অভিষেক ঝুড়িটা নামিয়ে খোলে। ভিতরে পাওয়া যায় মোমের একটা পুতুল। পুতুলটা দেখতে ঠিক সোনার মতোই। কিন্তু চোখ দুটো অস্বাভাবিক কালো। পুতুলের হাতে ছিল একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স। বাক্সটা খুলতেই অভিষেকের চিৎকার উঠে যায়। ভিতরে ছিল একটা ছোট্ট সাপের মূর্তি, ঠিক সোনার বর্ণনা করা মতোই। কিন্তু মূর্তির চোখ দুটো ছিল জ্বলজ্বল লাল, যেন রক্তে ভরা।

অমনি ঘরে আলো নিভে যায়। চারপাশে একটা গভীর অন্ধকার। হঠাৎ অভিষেকের কানে আসে ফিসফাস, “জিনিসটা ফিরিয়ে দাও…” কিন্তু কাউকে দেখা যায় না। ঘরের মধ্যে একটা অস্থিরতা, একটা শীতল নিঃশ্বাস তাদের গায়ে গায়ে লাগে।

অভিষেক জানে, এখন তাদের দু’জনেরই প্রাণ বিপদে। কীভাবে বাঁচতে হবে, কোথায় লুকোতে হবে, সেটা বুঝতে পারছে না সে। হঠাৎ আবার জ্বলে ওঠে আলো। অভিষেক চারপাশে তাকায়। সোনা নেই। কেবল পুতুলটা ফেলে রেখেছে সে, অস্বাভাবিক কালো চোখ দুটো অভিষেকের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে…

অভিষেকের শরীরটা কাঁপতে থাকে। ঘরের নিস্তব্ধতা যেন তার কানে গুঞ্জন ধ্বনি তৈরি করছে। চারপাশে সে সোনাকে খুঁজতে থাকে, কিন্তু কোনও সাড়াশব্দ নেই। পুতুলের দিকে তাকিয়েও সে একটা অস্বস্তি বোধ করে। পুতুলের সেই কালো চোখ দুটো যেন তাকে অনুসরণ করছে। হঠাৎ, অভিষেকের মনে পড়ে ঠাকুরঘরের কথা। হয়তো সোনা সেখানে লুকিয়ে আছে।

অভিষেক দ্রুত পা টিপটোয় ঠাকুরঘরের দিকে এগিয়ে যায়। ভেতরে ঢুকে সে আরও চমকে যায়। সোনা মূর্তির সামনে মাটিতে পড়ে আছে। তার চোখ বন্ধ, শরীরটা কাঁপছে। অভিষেক তার কাছে ছুটে যায়।

“ঠাম!” একটি গম্ভীর কণ্ঠস্বর তাকে থামিয়ে দেয়। অভিষেক চমকে ঘুরে দেখে। দরজার ফাঁক দিয়ে একটা লম্বা, কালো ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। ছায়াটা এতটা লম্বা যে, ঠাকুরঘরের ছাদ পর্যন্ত ছুঁয়ে যাচ্ছে। অভিষেকের হাত-পা কাঁপতে থাকে। সে জানে এই ছায়াটা ভালো কিছু নয়

“কে আপনি?” অভিষেক কষ্টে কথা বলতে পারে।

“আমি এ বাড়ির আসল মালিক,” ছায়াটা ফিসফিস করে বলে, “আর তোমরা আমার জিনিস নিয়ে এখানে কী করছ?”

অভিষেক সোনার দিকে তাকায়। সে এখনও অজ্ঞান। সে ছায়াকে বোঝানোর চেষ্টা করে, “আমরা কিছুই জানি না। আমরা শুধু সত্যিটা খুঁজছি।”

ছায়াটা একটা শুকতের মতো হাসে। একটা এমন শব্দ, যা অভিষেকের রক্ত জমাট বেঁধে দেয়।

“সত্যি?” ছায়াটা আবার বলে, “তাহলে জেনে নাও, সত্যি খুঁজতে এসে অনেকেরই জীবন শেষ হয়ে গেছে এই বাড়িতে।”

অভিষেক আরও ভয় পায়। সে জানে এখন কিছু না করলে হয়তো তার আর সোনার বাঁচবার কোনও রাস্তা থাকবে না। হঠাৎ সে তার পকেটে থাকা সেই ছোট্ট সাপের মূর্তির কথা মনে করে। সে জানে না কেন, কিন্তু মনে হয় এই মূর্তিই হয়তো তাদের বাঁচার একমাত্র আশা।

অভিষেক সাবধানে মূর্তিটা বের করে ছায়ার দিকে এগিয়ে যায়।

“এই নাও,” সে দৃঢ় কণ্ঠে বলে, “তুমি যা চাইছো, এই নেও। কিন্তু সোনাকে ছেড়ে দাও।”

ছায়াটা একটু থমকে যায়। তারপর সে ধীর গতিতে অভিষেকের দিকে এগিয়ে আসে। হাত বাড়িয়ে সে মূর্তিটা নেয়। মূর্তিটা হাতে নেওয়ার পর, ছায়াটা আরও একটা শুকতের মতো হাসে।

“ঠিক আছে,” সে বলে, “তোমাদের যেতে দিচ্ছি। কিন্তু মনে রেখো, এই গোপন রহস্য কখনও কারো ক

ছায়াটা কথা শেষ করার আগেই ঠাকুরঘরের দরজাটা জোরে বন্ধ হয়ে যায়। অভিষেক চমকে লাফিয়ে উঠে দরজা ধাক্কা দেয়, কিন্তু দরজা নাড়া পর্যন্ত দেয় না। ঘরের ভিতরে আঁধার নেমে আসে। হঠাৎ, ঠাকুরঘরের দেওয়াল জুড়ে সাপের ফণার মতো নকশাগুলি জ্বলজ্বল করে জেগে ওঠে। দেওয়ালে আঁকা সাপগুলো যেন ফিসফিস করে কথা বলছে, এক অজানা ভাষায়, যা অভিষেকের বুকে কাঠামারা ভয় জাগিয়ে দেয়।

সোনা এতক্ষণ অজ্ঞান অবস্থায় ছিল, কিন্তু এখন সে চোখ খুলে ফেলে। দেওয়ালের জ্বলজ্বল নকশা দেখে সে চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু তার চিৎকার কোনো ফল দেয় না। অভিষেক সোনাকে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করে।

“ঠিক আছে,” অভিষেক দৃঢ় কণ্ঠে বলে, “আমরা এখান থেকে বের হব।”

সে ঠাকুরঘরের কোণে থাকা একটা পুরনো হাঁটা দেখে। ঝুঁকে পড়ে সে হাঁটার ডাণ্ডাটা খুলে ফেলে। ডাণ্ডার ভিতরে একটা লোহার রড লুকানো ছিল। অভিষেক সেটা বের করে নেয় এবং দরজার তালাটা ভাঙতে চেষ্টা করে। কয়েকবার চেষ্টা করার পর, অবশেষে তালাটা ভেঙে যায়।

অভিষেক দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। সোনাকে ধরে সে দ্রুত পা টিপটোয় নিশীথের নির্বাসনের বাইরে চলে যায়। তারা রাস্তায় এসে একটু নিঃশ্বাস নেয়। পিছনে ফিরে তাকায় অভিষেক। নিশীথের নির্বাসনের বাড়িটা অন্ধকারে ঢাকা পড়ে আছে। যেন কিছুই হয়নি এখানে।

কিন্তু অভিষেক জানে, সব কিছুই বদলে গেছে। সে জানে, সেই ছায়াটা এখনও আছে, সেই রহস্যময় বাড়িতে, গোপন রহস্য নিয়ে। সূর্যের নিখোঁজ হওয়ার পেছনের রহস্য এখনও উদঘাটন হয়নি। কিন্তু একটা জিনিস সে জানে – কিছু রহস্যের উত্তর খোঁজার চেয়ে, সেগুলোকে ভুলে থাকাই ভালো। অভিষেক সোনার হাত ধরে রাতের অন্ধকারে হাঁটা চালিয়ে যায়, অজানা ভবিষ্যতের দিকে।

সপ্তাহ দুয়েক কেটে গেলেও অভিষেকের মনে নিশীথের নির্বাসনের ঘটনাগুলি ঘুরপাক খাচ্ছিল। সোনা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, সেই ভয়ঙ্কর রাতের ঘটনার ট্রমা তার শরীরে গাঁথা লেগেছিল। অভিষেক তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। চিকিৎসক সব শুনে কিছুটা বিস্মিত হলেও, অভিষেকের বর্ণনাকে মানসিক টানের ফল বলে মনে করেন।

একদিন সকালে, খবরের কাগজে একটা খবর অভিষেকের নজর কাড়ে। সেখানে লেখা ছিল – ‘নিশীথের নির্বাসনে অগ্নিকাণ্ড, এক বৃদ্ধা মৃত।’ খবরটা পড়ে অভিষেকের রক্ত জমে যায়। সোনা এখনও বিশ্রামে রয়েছে, তাই সে একাই নিশীথের নির্বাসনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

যে বাড়িটা একসময় অন্ধকারে ঢাকা থাকত, সেখানে এখন কালো ধোঁয়ার একটা ঘন স্তর লেগেছে। পুড়ো বাড়ির চারপাশে পুলিশের ঘেরাটো। অভিষেক একজন পুলিশ অফিসারের কাছে এগিয়ে যায় এবং নিজেকে পরিচয় করিয়ে নেয়।

অফিসারটি তাকে জানায় যে, সোনা দাস পুড়ে যাওয়া বাড়ির ভিতরেই মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছেন। প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের ফলেই আগুন লেগেছে। কিন্তু অভিষেক জানে, এটা কোনও দুর্ঘটনা নয়। নিশীথের নির্বাসনের রহস্য এখনও তাকে ডেকে আছে।

অভিষেক সোনার মৃত্যুর খবরটা গোপন রেখে হাসপাতালে ফিরে আসে। সোনাকে জানায় যে, নিশীথের নির্বাসনের বাড়িটা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, সেখানে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। সোনা কিছুটা হতাশ হলেও, অভিষেকের কথায় সায় দেয়।

কিন্তু সোনার অসুস্থতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সে প্রায়ই ঘুমের মধ্যে অস্পষ্ট কিছু ফিসফিস শোনে, আর দেখে সেই লম্বা কালো ছায়াটিকে। এক রাতে, অভিষেকের ঘুম ভেঙে যায় সোনার চিৎকারে। সে দেখে সোনা বিছানায় বসে আছে, চোখ দুটো বড় বড় করে ফেলে, যেন কিছু দেখছে।

“কী হয়েছে?” অভিষেক সোনার কাছে ছুটে যায়।

“সে এসেছে,” সোনা কাঁপা কণ্ঠে বলে, “সেই ছায়াটা। সে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে…”

অভিষেক চারপাশে তাকায়, কিন্তু সেখানে কিছুই দেখতে পায় না। কিন্তু সোনার চোখের ভয় দেখে সে বুঝতে পারে, এটা কোনও স্বপ্ন নয়।

হঠাৎ, সোনা নিথার হয়ে পড়ে। অভিষেক চিৎকার করে ডাক্তারদের ডাকে। কিন্তু সবকিছু নিঃশেষ। সোনা চলে গেল, নিশীথের নির্বাসনের রহস্য নিয়েই। হাসপাতালের শীতল শোকবার্তা সোনার মৃতদেহকে ঢেকে দেয়। অভিষেক একা হয়ে পড়ে, তার চারপাশে শুধু নীরবতা আর অসহ্য বোঝা।

কিন্তু আত্মসমর্পণ ছিল না তার ধর্ম। সে জানত, সোনার মৃত্যু কোনও দুর্ঘটনা নয়। নিশীথের নির্বাসনের রহস্যই ছিল এর মূল কারণ। সোনার মৃত্যুর পর, সে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হল, সেই রহস্য উন্মোচন করবেই।

অভিষেক পুরোনো খবরের কাগজপত্র খতি করতে শুরু করে। সে জানতে পারে, সূর্য, সোনার স্বামী, এক প্রতিভাবান রতনশিল্পী ছিলেন। কিন্তু তার খোঁজার খবর আর কখনও পাওয়া যায়নি। সেই সময়কার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ছিল, সূর্য একটি মূল্যবান রত্নখচিত সাপের মূর্তি খুঁড়ার চেষ্টা করছিলেন, নিশীথের নির্বাসনের পাশেই। কিংবদন্তি ছিল, সেই মূর্তিতে কোটিপতি হওয়ার মন্ত্র লুকিয়ে আছে।

এই তথ্য অভিষেকের মনে একটা সন্দে জাগায়। সে মনে করে, হয়তো সূর্য সেই মূর্তি খুঁড়তে গিয়ে কোনও সমস্যায় পড়েছেন এবং সেই ছায়ামূর্তিই তার মৃত্যুর কারণ। সেই একই ছায়া সোনাকেও হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হল, কে এই ছায়ামূর্তি? আর কী ছিল সেই মন্ত্রের গোপন কথা?

অভিষেক সিদ্ধান্ত নেয়, আবার নিশীথের নির্বাসনের জায়গায় যাওয়ার। পুড়ে যাওয়া বাড়ির ধ্বংসাবশেষের মধ্যে সে খোঁজে জলের একটি পুরনো ট্যাঙ্ক। ট্যাঙ্কের ঢাকনা খুলে সে চমকে যায়। ভিতরে ছিল সেই লোহারের রড, যা সে ঠাকুরঘরের দরজা ভাঙতে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু তার চেয়েও চমকপ্রদ ছিল, ট্যাঙ্কের এক কোণায় রাখা একটি পুরনো খাতা।

খাতাটা খুলে অভিষেক পড়তে শুরু করে। সেটা ছিল সূর্যের ডায়েরি। ডায়েরিতে সূর্য লিখেছেন, সে নিশীথের নির্বাসনের পাশে একটা গোপন কুঠুর খুঁজে পেয়েছেন। কুঠুরের ভিতরে ছিল রত্নখচিত সাপের মূর্তিটি এবং সেই পুরনো খাতা। কিন্তু মূর্তিটি হাতে নেওয়ার পর, একটা কালো ছায়ামূর্তি সূর্যের সামনে উপস্থিত হয়। ছায়ামূর্তিটি তাকে হুমকি দেয় এবং মূর্তি ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়। সূর্য অস্বীকার করলে, ছায়ামূর্তি তাকে আক্রমণ করে। সূর্য আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করলেও, সেই অতিপ্রাকৃত শক্তির সামনে টিকতে পারেননি।

ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা ছিল, ‘মন্ত্রটি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। সাবধান!’ শেষ লাইনটি কাঁপা হাতে লেখা ছিল, যেন সূর্য তার জীবনের শেষ মুহূর্তে এই সতর্কতা জানাতে চেয়েছিলেন।

ডায়েরিটি পড়ে অভিষেকের শরীরটা কাঁটা দেয়। সে বুঝতে পারে, নিশীথের নির্বাসনের রহস্য কতটা গভীর। সেই মূর্তিটি কোনও ধন-সম্পত্তি দেয়নি, বরং মৃত্যু ডেকে এনেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হল, কে সেই ছায়ামূর্তি? সে কি কোনও আত্মা, নাকি কোনও মানুষ্য অপরাধী?

অভিষেক সিদ্ধান্ত নেয়, পুলিশকে সব জানাবে। সে জানে, তার কাছে প্রমাণের অভাব আছে, কিন্তু সূর্যের ডায়েরিটি হয়তো তাদের তদন্তে সাহায্য করবে। পুলিশ অফিসার সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে অভিষেকের কথা শোনে। কিন্তু ডায়েরিটি দেখার পর, তার মনেও কিছুটা বিশ্বাস জন্মায়।

অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর, পুলিশ নিশীথের নির্বাসনের ধ্বংসাবশেষ নিচে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। কিছুদিন পর, ধ্বংসাবশেষের নিচে থেকে একটি গোপন কুঠুর উদ্ধার হয়। ঠিক যেমনটা সূর্য তার ডায়েরিতে বর্ণনা করেছিলেন। কুঠুরের ভিতরে পাওয়া যায় আর একটি রত্নখচিত সাপের মূর্তি। কিন্তু এই মূর্তিটি আগেরটির চেয়ে কিছুটা ভিন্ন ছিল। এর একটি চোখ ছিল নীল রত্ন দিয়ে তৈরি, আর অন্য চোখটি ছিল ফাঁকা।

পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, এই এলাকার এক ধনকুবের ব্যবসায়ী, রতনলাল, এই অতিপ্রাকৃত ঘটনার মূল কারণ। রতনলাল কালো জাদুবিদ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন। সে বিশ্বাস করতেন, নিশীথের নির্বাসনের নিচে লুকানো রয়েছে কোটিপতি হওয়ার মন্ত্র। তিনিই সূর্যকে হুমকি দিয়েছিলেন এবং পরে তাকে খুন করেছিলেন। কিন্তু মূর্তিটি হাতে নেওয়ার পর, রতনলালও মারা যান।

পুলিশের তদন্তে আরও জানা যায়, সোনার মৃত্যু দুর্ঘটনা নয়, খুন। রতনলালের লোকজনই সোনাকে হত্যা করেছিল, যাতে সে নিশীথের নির্বাসনের রহস্য প্রকাশ না করতে পারে।

কয়েক মাস পর, রতনলালের বিরুদ্ধে মামলা চূড়ান্ত রায়ে গেল। তাকে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা হলো। কিন্তু রহস্যের সম্পূর্ণ সমাধান হয়নি। কী ছিল সেই মন্ত্র, যা মৃত্যু ডেকে আনে? আর কেন মূর্তির একটি চোখ ছিল নীল রত্ন দিয়ে তৈরি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অমীমাংসিত থেকে গেল।

নিশীথের নির্বাসনের ধ্বংসাবশেষের পাশে দাঁড়িয়ে অভিষেক চোখ বন্ধ করে। সোনা, সূর্য, সবাই চলে গেছে। কিন্তু তাদের মৃত্যু অর্থহীন হতে পারে না। অভিষেক জানতো, সোনার মৃত্যু তার দায়বদ্ধতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই রহস্যের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত, নিশীথের নির্বাসনের ছায়া তার মন থেকে মুছে যাবে না।

একদিন, স্থানীয় লাইব্রেরিতে ঘুরতে গিয়ে অভিষেকের চোখ আটকে গেল এক পুরনো বইয়ের ওপর। বইটি ছিল প্রাচীন ভারতীয় তন্ত্রমantra ঐতিহ্যের ওপর। কৌতূহলে সে বইটি খুললো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে সে পড়তে থাকলো। বইটিতে এমন কিছু তথ্য ছিল, যা তার মনে একটা আশার আলো জাগিয়ে দিল।

বইটিতে উল্লেখ ছিল, কিছু বিশেষ ধরণের তন্ত্র সাধনায় কালো জাদুবিদ্যায় পারদর্শীরা কখনও কখনও ‘মৃত্যুদৃষ্টি’ অর্জন করতেন। এই দৃষ্টি দিয়ে তারা লোকেদের প্রাণ নিতে পারতো। কিন্তু এই দৃষ্টি অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল। যদি কোনও কারণে তন্ত্র সাধনা ঠিক মতো সম্পন্ন না হতো, তাহলে সেই দৃষ্টিই সাধকের নিজের প্রাণ নিয়ে ফেলত।

অভিষেকের মনে হলো, হয়তো এটাই হলো রহস্যের সমাধান। রতনলাল হয়তো এই ‘মৃত্যুদৃষ্টি’ অর্জনের জন্যই নিশীথের নির্বাসনের নিচে লুকানো মন্ত্র খুঁজছিলেন। কিন্তু মূর্তিটি হাতে নেওয়ার পর, হয়তো তিনি ঠিক মতো তন্ত্র সাধনা সম্পন্ন করতে পারেননি, ফলে সেই দৃষ্টিই তাকে হত্যা করে ফেলেছিল।

কিন্তু নীল রত্নের চোখের রহস্য এখনও অমীমাংসিত ছিল। লাইব্রেরিতে আরও কিছুদিন গবেষণা করে অভিষেক জানতে পারে, নীল রত্ন কখনও কখনও আত্মার বন্ধন স্থাপনের জন্য ব্যবহার করা হতো। হয়তো মূর্তির আরেকটি চোখেও এমনই কোনও রত্ন লাগানো থাকতো, কিন্তু রতনলাল হয়তো সেটা বুঝতে পারেননি বা খুঁজে পাননি।

নিশীথের নির্বাসনের রহস্যের সম্পূর্ণ উত্তর হয়তো কখনও পাওয়া যাবে না। কিন্তু অভিষেক জানতো, সে যা জানতে পেরেছে, তা যথেষ্ট। সে জানতো, সোনা ও সূর্যের মৃত্যু কোনও দুর্ঘটনা ছিল না। তারা নিজেদের জানের চেয়ে বড় রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

নিশীথের নির্বাসনের ধ্বংসাবশেষের পাশে দাঁড়িয়ে, সোনার কবরের দিকে ফুল ছুঁড়ে দিয়ে অভিষেক শেষবারের মতো ফিরে তাকালো। সে জানতো, এই জায়গাটা সর্বদাই তার মনের কোণে একটা ক্ষত হিসেবে থেকে যাবে। অভিষেক শহরে ফিরে এলো। সোনার মৃত্যুর শোক কাটতে দিন লাগল, কিন্তু সে জানতো জীবন থেমে থাকে না। লাইব্রেরিতে পাওয়া তথ্যগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। সে জানতো, নিশীথের নির্বাসনের রহস্যের সম্পূর্ণ উত্তর হয়তো কোনওদিন পাওয়া যাবে না, কিন্তু সে যা জানতে পেরেছে তা মানুষ্যের কৌতূহল আর ক্ষমতার লোভের ফল যে কী ভয়াবহ হতে পারে, সেটা বুঝতে সাহায্য করল।

সে সিদ্ধান্ত নিল, সোনার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটা উপায় খুঁজবে। সে লিখতে শুরু করলো – নিশীথের নির্বাসনের গল্প, রতনলালের কালো জাদুবিদ্যা, সোনার সাহস আর নিজের অসহায়ত্ব, সবকিছুই। লিখতে লিখতে সে অনুভব করলো, এটা শুধু তার গল্প নয়, এটা সতর্কতাও। সে চাইল, এই লেখা যেন মানুষ্যের অন্ধকার দিকগুলোর কথা জানায়, আর লোভের ফাঁদে পা না ফেলায় সাবধান করে।

কয়েক বছর পর, অভিষেকের লেখা বইটি প্রকাশিত হলো। বইটি মানুষের মনে তোলপাড় সৃষ্টি করলো। অনেকে বিশ্বাস করলেন না, কেউ কৌতূহলী হলেন, কেউ আবার ভয় পেলেন। কিন্তু একটা জিনিস ঠিক, বইটি নিশীথের নির্বাসনের রহস্যকে জীবিত রাখলো, একটা সতর্কবার্তা হিসেবে।

অভিষেক জানতো, সোনা ফিরে আসবে না। কিন্তু তার লেখা, তার গল্প, হয়তো অন্য কাউকে নিশীথের নির্বাসনের মতো রহস্যের কাছাকাছি যেতে বাধা দিতে পারবে। সে জানালার চেষ্টা করলো, কিছু রহস্য হয়তো সেরকম অমীমাংসিতই থাকা ভালো। কারণ, কখনও কখনও জানা, না জানার চেয়ে বেশি বিপদজনক হতে পারে। আর নিজের অতীতের সঙ্গে মোকাবিলা করতে শেখাই হচ্ছে সত্যিকারের সাহস।

এই রকম চিত্তাকর্ষক বাংলা ছোট গল্প -এর আপডেট পেতে আমাদের WhatsApp চ্যানেল জয়েন করুন।

নতুন বাংলা ছোট গল্প

প্রতিদ্বন্দ্বী

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: প্রতিদ্বন্দ্বী

শেষ জমিদারের মেয়ে

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: শেষ জমিদারের মেয়ে

স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

শিউলি, এক গ্রামের মেয়ে, তার অসাধারণ গানের প্রতিভা দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করে। কিন্তু খ্যাতির পথে তাকে অতিক্রম করতে হয় অনেক বাধা। এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পে দেখুন কীভাবে সে তার স্বপ্ন পূরণ করে এবং সকলের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

Leave a Comment

অনুলিপি নিষিদ্ধ!