নিশ্চিন্দপুরের নতুন বাসিন্দা দুই মেয়ে আহনা ও ঐশী। প্রতিবেশীদের অদ্ভুত আচরণে সম্পর্কের টান। সূর্যের আগমনে বন্ধুত্বের সুর।

সীমান্তে

নিশ্চিন্দপুরের নতুন বাসিন্দা দুই মেয়ে আহনা ও ঐশী। প্রতিবেশীদের অদ্ভুত আচরণে সম্পর্কের টান। সূর্যের আগমনে বন্ধুত্বের সুর।

কোলকাতার উত্তর দিকে, নিশ্চিন্দপুরের শান্ত কোণে একটা ছোট্ট পাড়ায় থাকতে এলো দুই মেয়ে, আহনা ও ঐশী। পুরনো, একতলা বাড়িটাটা ঈশান কোণের জমি পযর্দশ করে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বাগানে গোলাপ, রজনীগন্ধা আর জুঁই ফুলে ফুলে থাকে। আশেপাশে আরও কয়েকটা বাড়ি, কিন্তু খুব বেশি জনবসতি নেই। আহনা ও ঐশী দুজনেই চাকরি করে, তাই বাড়িতে থাকার সময়টা কম। তারপরও, একটু কোলাহল শুন্য পরিবেশের খোঁজে এটাই বেছে নিয়েছে।

প্রথম কয়েকদিন খুব একটা কাউকে দেখা হলো না। মাঝেমধ্যে একটু বয়স্কা একটি মাসি দুধ দিতে আসতেন, কিন্তু খুব একটা কথা বলত না। একদিন সকালে আহনা বারান্দায় দাঁড়িয়ে চায় খাচ্ছিল, দেখলো পাশের বাড়ির বৌদি কাপড় ধুচ্ছে। একটু হাসি মুখে আহনা জিজ্ঞাসা করল, “নমস্কার, আপনারা নতুন এসেছেন?”

“হ্যাঁ,” একটু থেমে জবাব দিল বৌদি, “আগের বাড়িওয়ালাদের ছেলে বিদেশে থাকে, বাড়িটা খালি পড়ে ছিল।”

“আমরা দুজনেই থাকি,” বলল আহনা আর একটু কাছে গেল। কিন্তু বৌদি আর কথা না বাড়িয়ে কাপড় ধোয়ায় মন দিলেন। আহনার মনে একটা অস্বস্তি ঢুকল।

ঐশী অফিস থেকে ফিরে এলো। আহনা ঘটনাটা খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে বলল। কিন্তু দু’দিন পর আবারও একই রকম অভিজ্ঞতা হলো। এবার পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে একটা ফুটপাথের চা দোকানে চা খেতে গিয়েছিল আহনা। দোকানদার কড়া চোখে তাকালো তাদের দিকে, তারপর চুপিসারে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়েকে কিছু একটা বলে দিল। মেয়েটির চোখে একটা অদ্ভুত কৌতূহল।

রাতে ঐশীকে আহনা সব বলল। দু’জনেরই মনে একটা অস্বস্তি জমে উঠল। কিন্তু এটা যে কেবল সন্দেহ, কোনও প্রমাণ নেই। তারপরও, পাড়ায় কারও সঙ্গে আলাপ জমাতে পারছে না, এটা সত্যি।

এক সন্ধেয় বাড়ির পাশে ছেলেদের একটা আড্ডা চলছিল। আহনা ও ঐশী বারান্দায় বসে কথা বলছিল। হঠাৎ সেই আড্ডা থেকে একটা ছেলে আহনার দিকে এগিয়ে এলো।

“এই বাড়িটা নতুন কিনলেন?” – জিজ্ঞাসা করল ছেলেটা।

“না,” জবাব দিল আহনা, “ভাড়া থাকি।”

“আপনারা…” – ছেলেটা একটু থেমে বলল, “দু’বোন?”

আহনার চোখ জ্বলে উঠল। “না,” বলল সে, “সেটা আপনার জানা দরকার?”

ছেলেটা একটু লজ্জা পেয়ে চলে গেল। ঐশী আহনার হাত ধরে রাখল। দু’জনের মধ্যে চুপচাপ একটা অস্থিরতা জমে থাকল।

পরের কয়েকটা দিনে আর কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু একটা অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা লেগে ছিল চারপাশে। একদিন সকালে ঐশী বাগানে গাছের পাতা ঝেড়ে দিচ্ছিল, দেখলো পাশের বাড়ির ছেলেটি বাগানের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কয়েকটা গোলাপ ফুল।

ছেলেটি একটু দ্বিধায় ছিল, তারপর ঐশীকে ডাকল। ঐশী কাছে গেল। ছেলেটি ফুলগুলো বাড়িয়ে দিল।

“আমি…আমি সেদিন…” – ছেলেটি থেমে গেল।

“আপনি ঠিক আছেন?” – জিজ্ঞাসা করল ঐশী।

“জি,” বলল ছেলেটি, “আমি…আমার নাম সূর্য।”

ঐশী হাসল, “আমি ঐশী, আর এটা আহনা।”

সূর্য ফুলগুলো আবার বাড়িয়ে দিল। “আপনারা নিন।”

ঐশী ফুলগুলো নিল। সূর্য একটু কথা বলার পর চলে গেল। ঐশী ফুলগুলো বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল। আহনা রান্নাঘরে ছিল।

“কে দেয়?” – জিজ্ঞাসা করল আহনা।

ঐশী সব খুলে বলল। আহনার মনে একটু সন্দে ছিল, কিন্তু ফুলগুলো এত সুন্দর যে সে কিছু বলতে পারল না।

দিন কয়েক পরে সকালে আহনা দেখল সূর্য বাগানের একটা কোণে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা গিটার। সে খুব আস্তে আস্তে গান গাইছিল। গানটা বাংলা, একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত। আহনা গান শুনতে শুনতে বাগানে নেমে গেল।

সূর্য গান থামিয়ে দিল। আহনা হাসল, “খুব সুন্দর গান গাইছিলেন।”

“আপনি শুনছিলেন?”

“হ্যাঁ,” বলল আহনা, “আপনি কি ঠিক আছেন? আজকাল প্রতিদিনই কিছু না কিছু করছেন।”

সূর্য একটু চুপ করে রইল, তারপর বলল, “আমি…আমি আপনাদের ব্যাপারে…”

আহনা বুঝলো কী বলতে চায় সূর্য। সে ঐশীকে ডেকে আনল। তিনজনে একসাথে বাগানে বসল। সূর্য সত্যি সত্যি বলল যে সে আগের দিনের আচরণের জন্যে অনুতাপ করছে। সে জানতো না আহনা ও ঐশী কারা। সে এ পাড়ায় বড় হয়েছে, এখানকার মানুষের মধ্যে এ রকম সম্পর্ক কখনো দেখেনি। কিন্তু গত কয়েকদিনে সে তাদের দেখেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করেছে।

আহনা ও ঐশী সূর্যের কথা শুনল। তার কথায় সততা ছিল। তারাও জানতো এমন জায়গায় তাদের সম্পর্ক মানিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। কিন্তু লুকিয়ে থাকার চেয়ে সত্যিটা বলতেই ভালো।

তারা সূর্যকে সব খুলে বলল। কীভাবে সমাজের চাপে তাদের এই সম্পর্ক গোপন রাখতে হয়, কীভাবে সামান্য সামান্য কিছুতেই অস্বস্তিবোধ করতে হয়, সব খুলে বলল। সূর্য মন দিয়ে শুনল। তার চোখে ছিল সহানুভূতি।

কথামালা শেষ হলো। একটা অদ্ভুত চুপচাপ নেমে এলো তিনজনের উপর।

“আমি বুঝি,” শেষে বলল সূর্য, “আমি জানতাম না। কিন্তু এখন জানলাম।”

এরপর কয়েকটা দিন একটু আলাদা চলল। সূর্য আর আহনা-ঐশীর সঙ্গে সরাসরি দেখা হলো না। কিন্তু মাঝেমধ্যে বাগানের গেটের কাছে রাখা ঠাকুরের থালার পাশে একটা ফুল দেখতো আহনা বা ঐশী। গোলাপ, রজনীগন্ধা, জুঁই – প্রতিদিন আলাদা ফুল। এটা যেন তাদের একটা নিঃশব্দ যোগাযোগের মতো হয়ে উঠল।

এক সন্ধেয় ঐশী বাগানে বসে ছিল। হঠাৎ দেখল সূর্য বাগানের দেওয়ালের ওপাশ থেকে গিটার বাজানোর আওয়াজ আসছে। গানটা আবারও রবীন্দ্র সঙ্গীত, কিন্তু এবারের গানের কথাগুলো ঐশীকে আচ্ছন্ন করে দিল।

‘…কে জানে কোন্ দেশে কোন্ জনমে…’

ঐশী গান শুনতে শুনতে বাগানের দেওয়ালের কাছে গেল। দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে দেখল সূর্য একা গান গাইছে। চোখ বন্ধ করে, মুখে একটা হাসি। ঐশীর মনে হলো, সে যেন সূর্যের মনের ভাষা বুঝতে পারছে।

গান শেষ হলো। সূর্য চোখ খুলল এবং ঐশীকে দেখে অবাক হয়ে গেল। কিন্তু অবাক হওয়ার চেয়ে তার চোখে ছিল আরও বেশি কিছু, হয়তো একটা আশা, একটা বোঝাপড়া।

ঐশী দেওয়ালের কাছেই দাঁড়িয়ে রইল। সূর্য তার গিটারটা নিয়ে ঐশীর কাছে এলো।

“আপনি কি…” – শুরু করল ঐশী।

“আমি জানি,” মাঝপথে থামিয়ে দিল সূর্য, “আপনি শুনছিলেন।”

ঐশী হাসল। এটা ছিল এক অদ্ভুত মুহূর্ত। দু’জনের মধ্যে কথা না হলেও অনেক কিছু বলা হয়ে গেল। হয়তো এটাই ভালো। কখনও কখনও কথার চেয়ে চুপচাপ, সুর, আর ফুলের রং বেশি কিছু বলে দেয়।

এরপর থেকে আহনা ও ঐশীর জীবনে একটা নতুন অধ্যায় শুরু হলো। সূর্য তাদের বন্ধু হলো। সে এখনও হয়তো সবার সামনে তাদের সম্পর্কের কথা বলতে পারে না, কিন্তু সে তাদের পাশে আছে, তাদের বোঝে। আর সামান্য কিছু বন্ধুত্বই তো অনেক সম্পর্কের চেয়ে বড় হয়। পুরনো, একতলা বাড়িটা আর নিঃশব্দ নেই। এখন সেখানে বাজে গান, ফোটে ফুল, আর জন্মায় নতুন বন্ধুত্বের সুর।

এই রকম চিত্তাকর্ষক বাংলা ছোট গল্প -এর আপডেট পেতে আমাদের WhatsApp চ্যানেল জয়েন করুন।

নতুন বাংলা ছোট গল্প

প্রতিদ্বন্দ্বী

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: প্রতিদ্বন্দ্বী

শেষ জমিদারের মেয়ে

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: শেষ জমিদারের মেয়ে

স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

শিউলি, এক গ্রামের মেয়ে, তার অসাধারণ গানের প্রতিভা দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করে। কিন্তু খ্যাতির পথে তাকে অতিক্রম করতে হয় অনেক বাধা। এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পে দেখুন কীভাবে সে তার স্বপ্ন পূরণ করে এবং সকলের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

Leave a Comment

অনুলিপি নিষিদ্ধ!