উনিশ শতকের শেষে কলকাতা, এক অসুস্থ পিতার পরিবারের পতনের গল্প। গ্রামের বাড়িতে ফিরে, তারা লালদীঘির ধারে একটি ছোট স্কুল স্থাপন করে। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার অবিচল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে একটি অনুপ্রেরণামূলক ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প।

লালদীঘির স্বপ্ন

উনিশ শতকের শেষে কলকাতা, এক অসুস্থ পিতার পরিবারের পতনের গল্প। গ্রামের বাড়িতে ফিরে, তারা লালদীঘির ধারে একটি ছোট স্কুল স্থাপন করে। জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার অবিচল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে একটি অনুপ্রেরণামূলক ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প।

আকাশটা কেমন যেন ম্লান, ঠিক যেন কালো মেঘেরা বাংলার মায়ের আঁচলে জড়িয়ে ধরেছে। ঊনিশ শতাব্দীর শেষের দিক, কলকাতা শহর যেন এক অস্থির স্বপ্নের মধ্যে দুলছে। রাসবিহারী রায়, এক সময়ের কাশীমবাজারের সফল ব্যবসায়ী, এখন অসুস্থ দেহ এবং শূন্য হাত নিয়ে নিজেরই বাড়িতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন। ব্যবসায় ধস নেমেছে, ধারের পাহাড় চেপে বসেছে। তার স্ত্রী, সরোজিনী, এক সময়ের সজীব চোখ আর নেই, চোখে শুধুই অসহায়ের বিষাদ। তাদের দুই ছেলেমেয়ে, শ্যামা ও গৌরব, অস্বস্তিতে দিন কাটায়।

একদিন সন্ধ্যায়, ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামছে। রাসবিহারী কষ্টে শ্বাস নিচ্ছেন। সরোজিনী চিন্তায় মনমরা হয়ে বসে আছেন। হঠাৎ, শ্যামা জোরে বলে ওঠে, “আমরা যদি গ্রামের বাড়িতে চলে যাই? ঠাকুরমার কাছে?”

রাসবিহারীর কপালে চিন্তার রেখা গাঢ় হয়ে ওঠে। তাদের পৈতৃক বাড়ি ছোট্ট গ্রাম কুশিয়ায়, ঢাকার কাছে। কিন্তু কলকাতায় এত বছর থাকায়, শহুরের জীবনেই অভ্যস্ত তারা। গ্রামের জীবন, কাদামাটির ঘর, সহজ স্বাভাবিকতা – এসব ভাবতেই একটা অস্বস্তি লাগে। তবু, পরিস্থিতি এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, আর কোনও উপায় নেই।

কয়েকদিন পর, ঢাকাগামী ট্রেনে জানালার পাশে বসে আছে শ্যামা। ট্রেন চলছে, বাইরে শুধুই সবুজের সমুদ্র। গৌরব এক কোণে জড়িয়ে বসে আছে। সরোজিনী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, “চিন্তা করিস না, গৌরব। কুশিয়ায় গিয়ে ঠাকুরমার কাছে থাকলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

কুশিয়ায় পৌঁছালে, ঠাকুরমা অপর্ণা তাদের আলিঙ্গনে নিয়ে কান্না করেন। গ্রামের জীবন শুরু হয়। শ্যামা স্কুলে যেতে পারে না, কিন্তু নদীর ধারে বসে গল্প শোনে গ্রামের বুড়োদের কাছ থেকে। গৌরব গাছের উপর চড়ে, ফল খায়। ধীরে ধীরে, শহুরের জীবনের ঝাঁকুনি কমে আসে।

একদিন, ঠাকুরমা অপর্ণা শ্যামাকে ডেকে নিয়ে লালদীঘির ধারে নিয়ে যান। লালদীঘি – কুশিয়ার প্রাণ। বিশাল জলাশয়টি সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে লাল শাপলা ফুল। অপর্ণা বলেন, “শ্যামা, এই লালদীঘির তলায় তোমার দাদু প্রতিশ্রুতি দেওয়াছিলেন, একদিন এখানে একটা স্কুল খুলবেন। গ্রামের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শিখবে। কিন্তু পারেননি।”

শ্যামার চোখ জ্বলে ওঠে। সে জিজ্ঞেস করে, “আমি কি কিছু করতে পারি, ঠাকুরমা?”

অপর্ণা হাসেন, “নিশ্চয়ই পার। তুমি লেখাপড়া জানো, গ্রামের ছেলেমেয়েদের শেখাতে পার।”

এভাবেই শুরু হয় শ্যামার নতুন জীবন। লালদীঘির ধারের একটা বটগাছের তলায় সে গ্রামের ছেলেমেয়েদের জড়ো করে পড়াতে শুরু করে। গৌরবও সাহায্য করে। সে ছবি আঁকে, গান শেখায়। ধীরে ধীরে, লালদীঘির তলায় একটা ছোট্ট স্কুল গড়ে ওঠে।

একদিন, কলকাতা থেকে একজন আইনজীবী কুশিয়ায় আসেন। তিনি রাসবিহারীর পুরনো বন্ধু ছিলেন। তিনি রাসবিহারীর অসুস্থতা এবং পরিস্থিতি জানতে পেরে তাঁদের দেখা করতে আসেন। স্কুলের কথা শুনে তিনি মুগ্ধ হন।

“এই তো দারুণ উদ্যোগ!” আইনজীবী বলেন, “আমি কলকাতায় ফিরে কিছু সাহায্যের চেষ্টা করব।”

কয়েক মাস পর, স্কুলের জন্য কিছু টাকা পাঠানো হয় কলকাতা থেকে। টাকা দিয়ে লালদীঘির ধারেই একটা ছোট্ট, চালের ঘর তৈরি করা হয়। স্কুলের নাম দেওয়া হয় “লালদীঘি বিদ্যাপীঠ”।

খবর গেলে, ঢাকা থেকে একজন ইংরেজ অফিসার আসেন স্কুল দেখতে। তিনি শ্যামার উদ্যোগে মুগ্ধ হয়ে স্কুলের জন্য আরও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন

এভাবেই, লালদীঘির তলায় শুরু হওয়া ছোট্ট স্কুলটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। শ্যামা একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষিকায় হয়ে ওঠেন। গ্রামের ছেলেমেয়েদের চোখে জ্ঞানের আলো জ্বলে ওঠে। রাসবিহারীর অসুখও কমতে থাকে। সরোজিনীর চোখে আবার আশার দীপ জ্বলে।

একদিন, সন্ধ্যের আকাশে সূর্য অস্ত হচ্ছে। লালদীঘির জলে সোনালি রোদের ঝিলিক। লালদীঘি বিদ্যাপীঠের ছাত্রছাত্রীরা গান গাইছে – “আমরা শিখব, আমরা জানব, এগিয়ে যাব আমরা…” শ্যামা মনে মনে ভাবে, ঠিকই তো।

বছরের পর বছর চলে গেল। লালদীঘি বিদ্যাপীঠ আরো বড় হলো। পাকা দালান, নতুন নতুন শিক্ষক, আর গ্রামের বাইরে থেকেও ছেলেমেয়েরা পড়তে আসতে শুরু করলো। শ্যামা এখন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। তার চোখে এখনও সেই স্বপ্নের ঝিলিক, কিন্তু তার সঙ্গে যোগ হয়েছে দায়িত্বের ভার।

একদিন, কলকাতা থেকে এক অপরিচিত চিঠি এল। চিঠিটি লিখেছিলেন শ্যামার শৈশব বন্ধু, সোমনা। সোমনা এখন কলকাতার এক বিখ্যাত কলেজের ছাত্রী। চিঠিতে লেখা ছিল, কয়েকজন সহপাঠী নিয়ে সে কুশিয়ায় আসতে চায় লালদীঘি বিদ্যাপীঠ দেখতে এবং গ্রামের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কিছুদিন কাটাতে। শ্যামা খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল।

কয়েকদিন পর, ট্রেন থেকে নেমে সোমনা ও তার বন্ধুরা লালদীঘি বিদ্যাপীঠের সামনে দাঁড়াল। বিদ্যালয়ের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ছাত্রছাত্রীদের উচ্ছ্বাস দেখে তারা মুগ্ধ হলো। কয়েকদিন লালদীঘির ধারে কাটিয়ে তারা গ্রামের জীবন উপভোগ করলো। কিন্তু সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হলো শ্যামার নিঃস্বার্থ নিষ্ঠায়। তারা ঠাকুরমার কাছে গিয়ে শ্যামার ছোটবেলার গল্প শুনলো, লালদীঘির তলায় স্কুল শুরুর কথা।

ফিরে যাওয়ার আগের রাতে, লালদীঘির ধারে বসে সবাই গল্প করছিল। সোমনা বললো, “শ্যামা, তোমার এই স্কুল দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমরা কলকাতায় ফিরে কিছু টাকা জোগাড় করে তোমার স্কুলের জন্য একটি লাইব্রেরি তৈরি করতে চাই।”

শ্যামার চোখে আবেগে জল চলে এলো। সে জানত, লালদীঘির স্বপ্ন আরো বড় হচ্ছে। এখন শুধু গ্রামের ছেলেমেয়ে নয়, শহরের ছেলেমেয়েরাও তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলেছে এই স্বপ্ন পূরণের পথে।

কয়েক মাস পর, কলকাতা থেকে বইয়ের বাক্স এলো। লালদীঘি বিদ্যাপীঠের পাশেই ছোট্ট, কিন্তু সুন্দর লাইব্রেরি উদ্বোধন হলো। লালদীঘির জলের মতোই ঝলমল করছিল নতুন বইয়ের সারি। শ্যামা মনে মনে ভাবলো, ঠাকুরদার লালদীঘির স্বপ্ন আর মরে নি। এখন এটা জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে চলেছে, গ্রামের, শহরের সবার মধ্যে।

এই রকম চিত্তাকর্ষক বাংলা ছোট গল্প -এর আপডেট পেতে আমাদের WhatsApp চ্যানেল জয়েন করুন।

নতুন বাংলা ছোট গল্প

প্রতিদ্বন্দ্বী

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: প্রতিদ্বন্দ্বী

শেষ জমিদারের মেয়ে

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: শেষ জমিদারের মেয়ে

স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

শিউলি, এক গ্রামের মেয়ে, তার অসাধারণ গানের প্রতিভা দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করে। কিন্তু খ্যাতির পথে তাকে অতিক্রম করতে হয় অনেক বাধা। এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পে দেখুন কীভাবে সে তার স্বপ্ন পূরণ করে এবং সকলের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

Leave a Comment

অনুলিপি নিষিদ্ধ!