অজিত মিত্র, একজন অসফল লেখক, তার নামের একজন খ্যাতিমান লেখকের সাথে দেখা করেন। ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে, সে তার জীবন চুরি করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার কি ভাগ্য সঙ্গ দেবে? - রহস্য রোমাঞ্চে ভরা এক বাংলা গল্প!

অধরা জীবন

অজিত মিত্র, একজন অসফল লেখক, তার নামের একজন খ্যাতিমান লেখকের সাথে দেখা করেন। ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে, সে তার জীবন চুরি করার চেষ্টা করে। কিন্তু তার কি ভাগ্য সঙ্গ দেবে? - রহস্য রোমাঞ্চে ভরা এক বাংলা গল্প!

সন্ধ্যার আবছা আলোয় কলকাতার রাস্তাগুলো যেন এক ধোঁয়াটে ক্যানভাসে আঁকা হচ্ছে। অজিত, একা একা হাঁটছিলেন, মনে এক অসহ্য অসফলতার জ্বালা নিয়ে। লেখক হিসেবে তার স্বপ্ন ছিল বিশ্ব সাহিত্যে নিজের নাম খোদাই করা। কিন্তু বছরের পর বছর চেষ্টা করেও তিনি পার হননি স্বীকৃতির চৌকাঠ দিয়ে। তার উপন্যাসগুলো প্রকাশকরা ফিরিয়ে দিতেন, “অনেক লিখছেন, কিন্তু কোনোটাই বাণিজ্যিক দিক থেকে টান নেই।” এই অসফলতায় তাঁর আত্মবিশ্বাস চূর্ণ হয়ে গেছে।

এমনি এক সন্ধেয়, বইয়ের এক পুরোনো দোকানে ঘুরতে ঢুকে পড়েন অজিত। মলিন, কাগজে মোড়া বইয়ের ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ চোখে পড়ে একটা নাম – অজিত মিত্র। অবাক হয়ে বইটা হাতে নেন তিনি। নিজের নামের সাথে মিলে যাওয়া এই লেখকের লেখা কোনোদিন শোনেননি তিনি। কিন্তু কৌতূহল জাগে। বইটা কিনে নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

বাড়ি ফিরে বইটা খুলে পড়তে শুরু করেন অজিত। উপন্যাসটা পড়তে পড়তে তাঁর রক্তে শীতল স্রোত বয়ে যায়। গল্পের নায়ক, অজিত মিত্র, ঠিক তাঁরই মতো এক অসফল লেখক। ছোটবেলার স্বপ্ন, বড় হয়ে ব্যর্থতা, প্রেমে ধোঁকা – সবকিছুই একই রকম। যেন তাঁর নিজের জীবনেরই একটা কাল্পনিক রূপ পড়ছেন তিনি।

কৌতূহল আর উত্তেজনা আরো বাড়ে। এই অজিত মিত্র কে? তিনি কিভাবে তাঁর জীবন সম্পর্কে এতো কিছু লিখলেন? এই লেখকের সাথে দেখা করতেই হবে – এই সিদ্ধান্তে উপন্যাসের শেষ পাতায় দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী দার্জিলিংয়ের পথ ধরেন অজিত।

দার্জিলিং পৌঁছে খুঁজে বের করেন সেই ঠিকানা। কিন্তু দরোজা খোলার সাথে সাথেই তাঁর চোখ কপালে উঠে যায়। দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি দেখতে ঠিক তাঁরই মতো! একই রকম চেহারা, একই রকম চোখ, এমনকি একই রকম ক্লান্তিভরা হাসি।

মুখ ফ্যাল ফ্যাল করে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, “আপনি কে?”

লোকটি হাসে। “আমি অজিত মিত্র।”

এরপর শুরু হয় অবিশ্বাস্য এক কাহিনী। এই অজিত মিত্র জানান, তিনিও একজন লেখক। কিন্তু তিনি অসফল নন। তাঁর লেখা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়, তিনি অর্থবান, সফল। তাঁর কাছে সবকিছুই আছে, শুধু একটা জিনিসের অভাব – সত্যিকারের সংগ্রামের অভিজ্ঞতা।

সেই অজিত মিত্র আরো বললেন, “আমরা দু’জন। কিন্তু আমরা এক নয়। আমরা ‘অজিত মিত্র’ নামের অনেকের মধ্যে দু’জন মাত্র। আমাদের মতো আরো অনেক অজিত মিত্র আছে বিশ্বের বিভিন্ন কোণে।”

অজিত, কলকাতার অজিত, একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। একটু সামলে নিজেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এটা কি করে সম্ভব?”

দার্জিলিংয়ের অজিত মিত্র তাঁকে ব্যাখ্যা করলেন এক অবিশ্বাস্য তত্ত্ব। তাঁদের মতে, জন্মের সময় মানুষের আত্মা এক বিশেষ ক্ষেত্রে বিভক্ত হতে পারে। যদি সেই বিভাজন সম্পূর্ণ না হয়, তাহলে একই আত্মার অংশ বিভিন্ন শরীরে জন্ম নেয়। এই অসম্পূর্ণ বিভাজনের ফলে, তারা সবাই জীবনে একই রকম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। তাদের নাম, কিছু জীবন অভিজ্ঞতাও একই রকম হয়। কিন্তু পরিবেশ, পরিস্থিতি, আর চারিত্রিক বৈशिষ্ট্যের পার্থক্যের কারণে তাদের জীবনের গতিপথ আলাদা হয়।

কলকাতার অজিতের মনে ক্ষোভ জাগল। নিজের সফল জীবনের গল্প শোনার পরে, তিনি ঈর্ষায় জ্বলে উঠলেন। এই অজিত মিত্রের জীবনে সবকিছুই আছে, যার জন্য তিনি বছরের পর বছর ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি দার্জিলিংয়ের অজিতকে প্রস্তাব দিলেন, “আপনার জীবন আমার দিন। চলুন জায়গা বদলাই। আমি আপনার জীবনটা নেব, আর আপনি আমারটা।”

দার্জিলিংয়ের অজিত অবাক হয়ে গেলেন। তিনি জানালেন, এই জিনিসটা সম্ভব নয়। তাদের আত্মার অংশ ঠিক থাকবে না, ফলটা হবে ভয়াবহ। কিন্তু কলকাতার অজিতের কানে ঢুকল না কোনো কথা। তিনি জোর করে ঢুকে গেলেন দার্জিলিংয়ের অজিতের বাড়িতে। রাতে, যখন দার্জিলিংয়ের অজিত ঘুমিয়ে পড়লেন, তখন তিনি তাঁর ঘুমের মধ্যে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দিলেন।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দার্জিলিংয়ের অজিত দেখলেন, তাঁর আশেপাশে সবকিছুই বদলে গেছে। আরামদায়ক বাড়ি নেই, বিলাসবহুল জীবন নেই। তিনি এখন কলকাতার অজিতের জীবনে, তাঁর ছোট্ট, আধোআঁধারি ফ্ল্যাটে। তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। কিন্তু কী করবেন, তা বুঝতে পারলেন না।

অন্যদিকে, কলকাতার অজিত এখন দার্জিলিংয়ের অজিতের জীবনে। বিলাসবহুল বাড়ি, স্বীকৃতি, সবকিছুই তাঁর হাতের মুঠোয়। কিন্তু আনন্দ আসল না। এই সুখের জীবনেও একটা ফাঁক থাকল। তিনি বুঝতে পারলেন, সফলতা আর স্বীকৃতিই সব নয়। সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়িয়ে আসা অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজের দিন কয়েক কাটল। কলকাতার অজিত, এখন দার্জিলিংয়ের অজিতের জীবনে, সবকিছুতেই একঘেয়েমি অনুভব করতে শুরু করলেন। বিলাসবহুল জীবনের ঝকঝকানি তাঁর কাছে আর মায়াবী লাগছিল না। লেখালেখির প্রতিও তাঁর আগ্রহ কমে গেল। কারণ, তিনি জানতেন, এই সফলতা আসলে তাঁর নয়।

অন্যদিকে, দার্জিলিংয়ের অজিত, এখন কলকাতার অজিতের ছোট্ট ফ্ল্যাটে বাস করছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়িয়ে আসা অভিজ্ঞতাই একজন লেখককে গভীরতা দেয়। তিনি কলকাতার অজিতের অপূর্ণ উপন্যাসগুলো পড়তে শুরু করলেন। সেগুলোতে অসফলতার ছাপ, জীবনের বাস্তবিকতা – এসবই ছিল, যেগুলো দার্জিলিংয়ের অজিতের লেখায় ছিল না। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে অনুপ্রাণিত করল। তিনি কলকাতার অজিতের লেখাগুলো সম্পাদনা করতে শুরু করলেন।

একদিন, কলকাতার অজিত বাড়ি ফিরে দেখলেন, তাঁর লেখার টেবিলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন একটা খাতা খোলা রয়েছে। তাতে লেখা – “অধরা জীবন”। তিনি পড়তে শুরু করলেন। উপন্যাসটা ছিল অসাধারণ। এটা ছিল দুই অজিত মিত্রের জীবনের গল্প – একজন সফল, কিন্তু অসন্তুষ্ট, আরেকজন অসফল, কিন্তু সত্যিকারের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। উপন্যাসটা পড়ে কলকাতার অজিতের চোখে জল এসে গেল। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি ভুল করেছেন। দার্জিলিংয়ের অজিতের কাছে তিনি ক্ষমা চাইতে দার্জিলিং যাত্রা করলেন।

দার্জিলিং পৌঁছে তিনি দেখলেন, দার্জিলিংয়ের অজিত তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। দু’জনে দুঃখ-মুখে একে অপরের কাছে সব স্বীকার করলেন। তারপর দার্জিলিংয়ের অজিত বললেন, “আমরা হয়তো আলাদা আলাদা অংশ, কিন্তু একই আত্মার। হয়তো আমাদের একসাথে কাজ করলেই সবচেয়ে ভালো হয়।”

কলকাতার অজিত সহমত হলেন। দু’জনে মিলে “অধরা জীবন” উপন্যাসটা সম্পূর্ণ করলেন। উপন্যাসটা প্রকাশিত হতেই তুমুল সাড়া পড়ল। লেখক হিসেবে দুই অজিত মিত্রের নাম বিশ্ব সাহিত্য জগতে ঝলমল করে উঠল। আর সেই সাথে, তারা বুঝতে পারলেন, সফলতা আসে নিজের গল্প লেখার মধ্য দিয়ে, আর সেই গল্প লেখার জন্য দরকার জীবনের অভিজ্ঞতা, সফলতা আর ব্যর্থতা, দুই-ই।

এই রকম চিত্তাকর্ষক বাংলা ছোট গল্প -এর আপডেট পেতে আমাদের WhatsApp চ্যানেল জয়েন করুন।

নতুন বাংলা ছোট গল্প

প্রতিদ্বন্দ্বী

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প - প্রতিদ্বন্দ্বী, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত জীবন যুদ্ধের দুই যোদ্ধার একদিনের জীবন সংগ্রামের ঘটনা। সম্পুর্ন্য বাংলা অনুপ্রেরণামূলক ছোট গল্পটি পড়ুন।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: প্রতিদ্বন্দ্বী

শেষ জমিদারের মেয়ে

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ঐতিহাসিক কথাসাহিত্য গল্প: এক জমিদার কন্যার গল্প, যে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তির পর নিজের পায়ে দাঁড়ায় এবং গ্রামের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: শেষ জমিদারের মেয়ে

স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

শিউলি, এক গ্রামের মেয়ে, তার অসাধারণ গানের প্রতিভা দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করে। কিন্তু খ্যাতির পথে তাকে অতিক্রম করতে হয় অনেক বাধা। এই অনুপ্রেরণামূলক গল্পে দেখুন কীভাবে সে তার স্বপ্ন পূরণ করে এবং সকলের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: স্বপ্নের রূপে ঝঙ্কার

Leave a Comment

অনুলিপি নিষিদ্ধ!