বিপরীত মন

"বিপরীত মন" একটি রহস্য রোমাঞ্চ বাংলা ছোট গল্প, যেখানে প্রেম, ক্ষমতা, এবং অপরাধের গভীর অন্ধকার দিক উন্মোচিত হয়। একটি মানসিক খেলার মাধ্যমে ঘটতে থাকে একের পর এক হত্যাকাণ্ড।

আমাদের WA চ্যানেল জয়েন করুন

এই মাসের সেরা অন্য স্বাদের রহস্য-রোমাঞ্চ বাংলা ছোট গল্প পড়ুন ও অডিও স্টোরির স্বাদ উপভোগ করুন – বিপরীত মন

রচনা - সুরজিৎ রায়   ||   গল্প পাঠে:  কথক - চয়ন দে;  ঈশা - ঈশিতা পাল; সায়ন ও ড: সিদ্ধার্থ মজুমদার - শুভজিৎ পাল; সমরেশ ও সত্যজিৎ দেবনাথ - বিশ্বজিৎ বিশ্বাস; অপরাজিতা,  মধুমিতা,  স্মিতা ও সংবাদ পাঠিকা - সোমা চক্রবর্ত্তী; আদিত্য ও ড: প্রীতম দাস - সুশ্যামল সাঁপুই; অর্জুন সেন, রাহুল বোস, ওসি বিক্রম ও পুরুষ কন্সটেবল - কল্যাণ সরকার; রিতিকা, মহিলা কন্সটেবল রিসেপশনিস্ট ও রঞ্জনা সেন - ঐশী পট্টনায়ক; অরিন্দম - সুমিত বিশ্বাস   ||   শব্দ সম্পাদনা - সুজয় ভুঁইয়া   ||   শব্দ পরিমার্জনা ও মিশ্রণ - বিশ্বজিৎ বিশ্বাস   ||   রেকর্ডিং স্টুডিও - কাহানী স্টুডিওজ্ 

অধ্যায় ১: চোখ থাকতে অন্ধ

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

২০২৩ সালের জুন মাস। স্থান: অরিন্দম বসু’র বাড়ি, সময়: সকাল ৮ টা. (কিছু মানুষ-এর কথা বার্তা একজন ১৪ বছরের মেয়ের [অরিন্দম বসুর মেয়ে রিতিকা] কান্না, ও অরিন্দম বসুর স্ত্রীর কান্না)

অরিন্দম বসুর স্ত্রী (মধুমিতা বসু): (কাঁদতে কাঁদতে) তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেলে কেন? আমাদের এখন কি হবে? হে ভগবান তুমি এতো নিষ্ঠুর হলে কি করে? 

অরিন্দম বসুর মেয়ে (রিতিকা): (কাঁদতে কাঁদতে) বাবা তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেলে কেন?

শহরের নামকরা ব্যবসায়ী অরিন্দম বসুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। সকালে তাঁর স্ত্রী, মধুমিতা বসু, স্বামীর দেহ ঘরের সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কাঁপা হাতে তিনি স্থানীয় থানায় খবর দেন।  

সাব-ইন্সপেক্টর সমরেশ বিশ্বাস দ্রুত তাঁর টিম নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই নিস্তব্ধ পরিবেশ আর মৃত্যুর গন্ধে অস্বস্তি বোধ করেন তিনি। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে মনে হয় এটি আত্মহত্যার ঘটনা।

তবে, সমরেশের অভিজ্ঞ চোখে কিছু সন্দেহের ছবি ধরা পড়ে ধরে। অরিন্দম বসুর বুক পকেটে থাকা সুইসাইড নোট উদ্ধার করে তিনি দ্রুত দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর নির্দেশ দেন। অন্তরে একটাই প্রশ্ন—এটা সত্যিই আত্মহত্যা, নাকি কোন রহস্য লুকিয়ে আছে? সুইসাইড নোট-এ লেখা ছিল,

প্রিয়,

আমি স্বীকার করছি, জীবনে আমি অনেক ভুল করেছি। আমার লোভ, আমার অমানবিক আচরণ, এবং টাকার প্রতি আসক্তি আমাকে আমার সত্যিকার মানুষত্ত্ব থেকে বঞ্চিত করেছে। আমি টাকা ইনকাম করার নেশায় এতটাই ডুবে গিয়েছিলাম যে, মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখাই ভুলে গিয়েছিলাম। আমার ভুলের কোন ক্ষমা হয় না, তবুও আপনারা যদি পারেন, আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি এই ভুলগুলো শুধরে নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করেও করতে পারিনি। তাই আমি আপনাদের সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছি।   

সদয়, অরিন্দম

সমরেশ বিশ্বাস রিতিকার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। মাত্র চোদ্দ বছর বয়স, অথচ চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। বাবার মৃত্যুটা ওর কাছে কতটা স্বাভাবিক, সেটা বোঝা মুশকিল।  

তিনি ফোন বের করে দ্রুত অপরাজিতা চ্যাটার্জ্জীকে কল করলেন। অপরাজিতা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর হলেও ওর ক্রিমিনোলজির ওপর দারুণ দখল ছিল।  

সমরেশ: “অপু, একটা কেসে তোমার দরকার আছে।”

অপরাজিতা: (গলায় কৌতূহল) “কোন কেস?”  

সমরেশ: “অরিন্দম বসুর আত্মহত্যা। কাগজে যেটা আত্মহত্যা লেখা হবে, আমার মনে হচ্ছে সেটা পুরোপুরি সত্যি নয়।”

অপরাজিতা: “হুঁ… সন্দেহজনক কিছু পেয়েছ?”

সমরেশ: “হয়তো। তুমি এখন একবার এখানে এসো, তারপর বলছি।”

ফোন রেখে সমরেশ এবার রিতিকার দিকে তাকালেন।  

সমরেশ: “তোমার বাবার সাথে শেষবার কবে কথা হয়েছিল?”  

রিতিকা: (কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল) “গতকাল সন্ধ্যায়। বাবা একটু চিন্তিত ছিল।”

সমরেশ: “কী ধরনের?”

রিতিকা: “ঠিক জানি না।”

সমরেশ একবার মধুমিতা বসুর দিকে তাকালেন। তিনি ফ্যাকাশে মুখে একপাশে বসে আছেন, একদম নিশ্চুপ। তবে সত্যিই কি অরিন্দম বসু ভয় পাননি, নাকি কাউকে কিছু না বলেই চিরদিনের জন্য নিশ্চুপ হয়ে গেলেন? কিছুক্ষণের মধ্যে অপরাজিতা অরিন্দম বসুর বাড়িতে এসে পৌঁছালেন। 

অপরাজিতা মধুমিতা বসু এবং রিতিকা ‘কে সান্ত্বনা দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। সমরেশ বিশ্বাস ও ওই জিজ্ঞাসাবাদে যোগ দিল।

অপরাজিতা: আচ্ছা মধুমিতা দেবী আপনি বলুন আপনাদের মধ্যে কোনো সাংসারিক অশান্তি বা ঐরকম কিছু ছিল?

মধুমিতা: (কাঁপা গলায়) না।

অপরাজিতা: অনিরুদ্ধ বাবু কি কোনো মানসিক চাপে ছিলেন?

মধুমিতা: শেষ কয়েদিন ধরে খুব অস্থিরতার মধ্যে ছিল। ড্রিংক করা’ও বেড়ে গিয়েছিল।

অপরাজিতা: আচ্ছা। কাল সারাদিন বিশেষ করে সন্ধ্যে থেকে কি কি হয়েছিল? রিতিকা, একটু খুলে বলতে পারবে?

রিতিকা: কাল রাতে বাবা একটু দেরি করে অফিস থেকে ফিরেছিল। তারপর আমরা অন্য দিনের মতো একসাথে ডিনার করতে বসি। (একটু থেমে) হ্যা! আমি একটা শর্টস ভিডিও দেখছিলাম; ওটা বাবা কে দেখানোর পর বাবার মুখ কেমন শুখিয়ে যায়…..

অপরাজিতা: (রিতিকা কে থামিয়ে দিয়ে) কি ধরনের ভিডিও ছিল কিছু বলতে পারবে?

রিতিকা: ভিডিওটিতে দেখাচ্ছিল, “একজন কপট লোভি ব্যবসায়ী কিভাবে টাকার লোভে তার নিজের স্ত্রী ও মেয়েকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। শেষে ওর মেয়ে মারা যায়।”

অপরাজিতা: (কৌতূহলের সুরে) তারপর?

রিতিকা: তারপর আমি বাবাকে বলি, “বাবা তুমি খুব ভালো, এই রকম নিষ্ঠুর না। আমি তোমাকে আর মাকে খুব ভালোবাসি।”

অপরাজিতা: আচ্ছা! রিতিকা, তুমি একটু বাইরে যাও আমরা তোমার মায়ের সাথে একটু আলাদা ভাবে কথা বলবো।

রিতিকা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে গেল। অপরাজিতা মধুমিতা বসুর দিকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন,

অপরাজিতা: আপনার স্বামী কি বেআইনি কিছু কাজ করতো কিংবা ওই ধরণের কিছু?

মধুমিতা: না! আমার সেই রকম কিছু জানা নেই, তবে খুব কঠোর প্রকৃতির মানুষ ছিল। অফিস’এ কর্মচারীদের সাথে ভালো ব্যবহার করতো না। 

সমরেশ: আচ্ছা, আপনি একটু মনে করে বলতে পারবেন, লাস্ট ১-২ মাসে অরিন্দম বাবুর মধ্যে কিছু নতুন পরিবর্তন দেখতে পেয়েছেন কিনা? মানে ব্যবহার, নতুন জায়গায় যাওয়া, নতুন কারোর সাথে সম্পর্ক তৈরী করা, কিংবা আপনাকে এড়িয়ে ফোন কারোর সাথে কথা বলা?

মধুমিতা: না! সেই রকম তো কিছু মনে পড়ছে না!

অপরাজিতা: আপনারা স্বামীর বিবাহ বহির্ভুত কোনো সম্পর্ক?

মধুমিতা: (একটু চিৎকার করে) এসব আপনারা কি বলছেন!

অপরাজিতা: উত্তেজিত হবেন না! শান্ত হন। একটু জল খান। 

অপরাজিতা একটা জলের গ্লাসে জল ঢেলে মধুমিতার দিকে এগিয়ে দিলেন, মধুমিতা একটু জল খেয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে কিছু একটা ভেবে বলতে শুরু করলো,

মধুমিতা: আজ থেকে ২ মাস খানিক আগে; একদিন রাতে আমরা শুয়ে ছিলাম। ও মোবাইল এ কিছু একটা দেখছিল। তারপর হটাৎ উঠে বসে, কিন্তু কিছু একটা ভেবে আবার শুয়ে পরে। তার ৪-৫ দিন পর আমাকে একা দেখে বলে,

অরিন্দম: আমার একবার সাইকোলজিস্ট কে দেখানো দরকার আছে।

মধুমিতা: আমি কথাটাকে গুরুত্ব না দিয়ে হেসে উড়িয়ে দিই। (মধুমিতা আবার কাঁদতে শুরু করে) হয়তো সেদিন  সাইকোলজিস্ট-এর কাছে যেতে বারণ না করলে আজ আমাদের এই দিন দেখতে হত না। 

অপরাজিতা, মধুমিতা বসুর হাত ধরে উনাকে সামলাতে থাকেন। ততক্ষনে সমরেশ বিশ্বাসের হটাৎ চোখ পড়ে টেবিল-এ রাখা একটা ডাইরিতে। ডাইরিটা হাতে নিতে ওর ভেতর থেকে একটা ভিসিটিং কার্ড পড়ে যায়। ভিসিটিং কার্ড -এ লেখা ছিল,

“নতুন আশা 

ঈশা রায়

থেরাপি – সাইকোলজিস্ট”

মোবাইল নম্বর আর ঠিকানা লেখা ছিল। 

সমরেশ বিশ্বাস ডাইরি টি খুলে পড়তে শুরু করলেন, ওটা অরিন্দম বসুর ক্যালেন্ডার ডাইরি ছিল। সমরেশ বসু ডাইরি-টি পড়ে জানতে পারেন যে, অরিন্দম বসু শেষ দেড় মাস ধরে সাইকোলজিস্ট – ঈশা রায়ের কাছে থেরাপি নিতে যেতেন। সমরেশ মধুমিতার দিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

সমরেশ: আপনারা স্বামী থেরাপি নিতেন। আপনাদের হয়তো বলেন নি!

মধুমিতা কথাটা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সমরেশ অপরাজিতার দিকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

সমরেশ: অপু, আমাদের আর এখানে বিশেষ কিছু কাজ নেই, থানায় চলো। 

তারপর ওরা অরিন্দম বসুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে থানার দিকে রহনা দিল। থানায় পৌঁছে সমরেশ ভিসিটিং কার্ড এ দেওয়া নম্বর-এ দেওয়া মোবাইল নম্বর’এ ঈশা রায় কে ফোন করলো,

সমরেশ: হ্যালো! ঈশা রায় কথা বলছেন?

ঈশা: হ্যা! বলছি। কে বলছেন?

সমরেশ: আমি সাব ইন্সপেক্টর সমরেশ বিশ্বাস, গড়িয়াহাট থানা। আপনার একজন প্রেসেন্ট, অরিন্দম বসু কাল রাতে সুইসাইড করেছেন। ওই ব্যাপারে আপনার সাথে কিছু কথা ছিল। 

ঈশা: (একটু চমকে গিয়ে) আপনি এ কি বলছেন? আমি কি এখন থানায় আসবো?

সমরেশ: না! এখন আসার দরকার নেই। শুধু আমাকে এইটুকু বলুন, উনি কি ধরণের মানসিক রোগে ভুগছিলেন?

ঈশা: অরিন্দম বসু, একজন ধনী ব্যবসায়ী, যার রুক্ষ স্বভাব এবং অমানবিক আচরণ তাকে পরিচিত মহলে ভয়ঙ্কর করে তুলেছিল। তার কর্মচারীদের ওপর নিষ্ঠুরতা ছিল প্রায় কিংবদন্তিসম। কিন্তু উনার ওই আচরণের জন্য উনি আত্মগ্লানিতে ভুগছিলেন। সেই জন্য উনি প্রচুর ড্রিংক করতেন। আমার থেরাপি সেসন এ ২-৩ বার উনি রেগেও গিয়েছিলেন। কিন্তু উনার আচরণে আমার কখনো মনে হয়নি যে উনি আত্মহত্যা করবেন।

সমরেশ: ধন্যবাদ! আমাদের ইনভেস্টিগেশন এ আবার যদি প্রয়োজন হয় তাহলে আমি আপনাকে আবার ফোন করবো অথবা আপনাকে থানায় দেখে নেবো। 

ঈশা: অবশ্যই! আমি আপনাদের এই ইনভেস্টিগেশন এ সাহায্য করার জন্য কথা সাধ্য চেষ্টা করবো। 

সমরেশ: ওকে, এখন তাহলে ফোন রাখছি। 

ঈশা: ওকে.. বাই!

২-৩ দিন পড়ে সমরেশ বিশ্বাস অরিন্দম বসুর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পান। রিপোর্ট থেকে জানতে পারেন, অরিন্দম বসু ফাঁসি লাগিয়ে সুইসাইড করেছে, সুসাইডের আগে প্রচুর মদ্য-পান এর কথা ও জানতে পারেন। থানা থেকে কেসটা’কে সুইসাইড হিসেবে ক্লোজ করা হয়।

অধ্যায় ২: অতি লোভে তাতি নষ্ট

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

সেই ঘটনার পর ৩-৪ মাস পেরিয়ে গেছে। সমরেশ বিশ্বাস এবং অপরাজিতা চ্যাটার্জী প্রায় অরিন্দম বসুর কেসটা নিয়ে সেইভাবে আলোচনা করেননি। একটা নিতান্ত আত্মাহত্যার কেস হিসেবে ধরে নিয়ে ছিলেন। একদিন সকালে চা খেতে খেতে সমরেশ বিশ্বাস টিভি’তে একটা খবর দেখতে পান।

টিভি সঞ্চালক:

ব্রেকিং নিউজ! সল্টলেকে ওষুধ ব্যবসায়ী অমল ঘোষের আত্মহত্যা

নমস্কার, আমি সোমা, আপনাদের সাথে আছি আজকের ব্রেকিং নিউজ আপডেট নিয়ে।

সল্টলেকের বিখ্যাত ওষুধ ব্যবসায়ী অমল ঘোষ আজ সকালে নিজের বাসভবনে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। সূত্রের খবর, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অশান্তিতে ভুগছিলেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মানসিক অবসাদের কারণে তিনি গত কয়েকদিন সাইকোলজিস্ট ঈশা রায়ের কাছে থেরাপি নিতে যেতেন। তবে আত্মহত্যার সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। সল্টলেক থানার পুলিশ সাব ইন্সপেক্টর আদিত্য নস্কর ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে।

আরও বিস্তারিত জানতে চোখ রাখুন আমাদের পরবর্তী নিউজ আপডেটে।

খবরটা দেখে সমরেশ চমকে উঠলেন। তিনি তাড়াতাড়ি মোবাইল’টা নিয়ে অপরাজিতা কে কল করলেন,

সমরেশ: হ্যালো, অপু! ফ্রি আছো?

অপরাজিতা: হ্যা! বলো। 

সমরেশ: সল্টলেকের অমল ঘোষের সুইসাইড-এর খবরটা শুনেছ?

অপরাজিতা: না! (একটু থেমে) আর সল্টলেক থানার খবর নিয়ে আমি কি করবো। বাই-দা-ওয়ে, কি হয়েছে বলো। 

সমরেশ: সল্টলেকের অমল ঘোষ বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন, কিন্তু বড় খবর হলো তিনিও থেরাপি নিতে সাইকোলজিস্ট ঈশা রায়-এর কাছে যেতেন। 

অপরাজিতা: ঈ…শা… রায়……! মানে যিনি অনিরুদ্ধ বসুর সাইকোলজিস্ট ছিলেন। 

সমরেশ: (একটু উত্তেজিত হয়ে) এক্সাক্টলি!

অপরাজিতা: তো! কি হয়েছে? একজন সাইকোলজিস্ট এর দুজন প্রেসেন্ট কি সুইসাইড করতে পারে না? আর এমনিতেই সাইকোলজিস্ট কাছে তো ওই ধরণের মানুষ যায়। এতে বেশি ভাবার কি আছে। 

সমরেশ: (একটু গম্ভীর সুরে) ভাবার আছে অপু, ভাবার আছে। আমার কোথাও একটা খটকা লাগছে। জিনিসটাকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। 

অপরাজিতা: (একটু হেঁসে, মজার ছলে) রাত দিন ডিউটি করতে করতে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, তুমি একটু রেস্ট নাও। (আবার একবার হেঁসে) তুমি একবার সাইকোলজিস্ট এর কাছে যাও। 

সমরেশ: আচ্ছা, সে যাবো ক্ষণ! তোমার কাছে সল্টলেক থানার সাব ইন্সপেক্টর আদিত্য নস্কর -এর ফোন নম্বর আছে?

অপরাজিতা: দাড়াও দেখছি! (একটু পরে) তোমাকে নম্বর হোয়াটস্যাপ করেছি, দেখে নাও।

সমরেশ: হুমম পেয়ে গেছি। থ্যাংক ইউ সুইট হার্ট!

অপরাজিতা: হুমম! সু….ই…ট হা…র্ট…! কাজের বেলায় কাজী, কাজ ফুরোলে পাজি।

সমরেশ: আচ্ছা চলো পরে কথা বলছি। বাই!

অপরাজিতা: বাই!

সমরেশ আদিত্য নস্কর কে ফোন করলেন,

সমরেশ: জয় হিন্দ! মিস্টার নস্কর!

আদিত্য: জয় হিন্দ! কে বলছেন?

সমরেশ: আমি গড়িয়াহাট থানার সাব ইন্সপেক্টর, সমরেশ বিশ্বাস কথা বলছি, অমল ঘোষের সুইসাইড কেসটা আপনি দেখছেন তো? খবরে দেখলাম?

আদিত্য: হুমম! কেন আপনি উনাকে চিনতেন? মানে কোনো পার্সোনাল রিলেসন?

সমরেশ: না! তবে অমল ঘোষের কেস এর মতো একটা কেস আমার থানায় কিছুদিন আগে ঘটেছিল। আমি কোনো একটা জায়গায় যোগসূত্র পাচ্ছি। 

আদিত্য: কি….ন্তু…..! আমার প্রাথমিক তদন্তে এটা সুসাইড বলে মনে হচ্ছে। আপনি কি বলতে চাইছেন এটা মার্ডার?

সমরেশ: না আমি সেটা বলতে চাইছি না। এটা সুইসাইড’ই। 

আদিত্য: তবে?

সমরেশ: ওখানেই তো সন্দেহ বেশি হচ্ছে! কিছু একটা মিস করছি। 

আদিত্য: আমি কিছু বুঝতে পারছি না সমরেশ বাবু। 

সমরেশ: আচ্ছা, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পাওয়ার পর রিপোর্টটা নিয়ে আপনি একবার আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন, তবে ওটা আন-ওফিসিয়াললি হবে।

আদিত্য: হুমম করা যেতে পারে, তবে কিছু মনে করবেন না, আপনি আপনার অফিসিয়াল আইডি কার্ডটা সাথে আনবেন, মা…নে… বুঝতেই পারছেন। 

সমরেশ: ওকে, তাহলে আমরা দেখা করে বাকি কথা বলবো, কোথায় কবে দেখা করবো সেটা ফোনে কথা বলে নেবো। বাই, জয় হিন্দ!

আদিত্য: বাই! জয় হিন্দ!

পুর্বের পরিকল্পনা মতো ৫-৭ দিন পর আদিত্য, সমরেশ কে কল করে দেখা করার কথা বলেন। সমরেশ জানায় অপরাজিতা’ও তার সঙ্গে থাকবে। আদিত্য প্রথমে রাজি না হলেও পরে সমরেশের অনুরোধে রাজি হন। সমরেশ ও অপরাজিতা নিদিষ্ট দিনে এক সন্ধ্যায় আদিত্য নস্করের সাথে দেখা করতে যান। সেটা একটা রেস্তোরায়। সমরেশ ও অপরাজিতা আদিত্য নস্কর কে নিজেদের পুলিশ আইডি কার্ড দেখিয়ে পরিচয় দেন। তারপর সবাই রেস্তোরার একটা বন্ধ কেবিনে দুটো সুইসাইড কেস গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করেন;

সমরেশ: থ্যাংক ইউ! আদিত্য বাবু আমাদের সাহায্য করার জন্য। 

আদিত্য: ইওর ওয়েলকাম! আচ্ছা এবার ব্যাপারটা খুলে বলুন তো! আপনার কথা আমি কিছু বুঝতে পারছি না। এই দেখুন পোস্টমর্টেম রিপোর্ট -এ পরিষ্কার করে লেখা আছে, ভিকটিম বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে। আর আপনি’ও সেদিন স্বীকার করেছেন যে, এটা আত্মহত্যা’ই। তাহলে মশাই, সমস্যাটা কোথায় আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

সমরেশ ঈশা রায় এর ভিসিটিং কার্ড টা বের করে টেবিল এ রাখলো। আদিত্য’র দিকে উদ্দেশ্য করে বললো,

সমরেশ: সমস্যা এটা! আমার কেসের ভিকটিম আর আপনার কেসের ভিকটিম একজনের কাছে থেরাপি নিচ্ছিল। আর আমি যতদূর সূত্র মারফতে জানতে পেরেছি দুজন ভিকটিম’ই ভালো লোক ছিলেন না। আমি তো এটাও শুনেছি অমল ঘোষ জাল ওষুধের কারবার করতেন, আর অনিরুদ্ধ বসু মানি লৌন্ডরিং এর সাথে যুক্ত ছিলেন। 

আদিত্য: (একটু চিন্তিত হয়ে) অমল ঘোষ আর অনিরুদ্ধ বসু এর মধ্যে কোনো যোগাযোগ?

সমরেশ: না!

আদিত্য: তবে কি ওই সাইকোলজিস্ট ঈশা রায় বা উনার কোনো পরিবারের সদস্য, বা কাছের কেউ ভিকটিমদের দ্বারা কোনো ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ্য হয়েছিল?

সমরেশ: সেটা হতেও পারে, কিংবা না ও হতে পারে?

অপরাজিতা এতক্ষন চুপ-চাপ সব শুনছিলেন, এবার তিনি বললেন,

অপরাজিতা: আমাদের একবার ঈশা রায়ের ব্যাপারে জানা দরকার আছে। 

আদিত্য: তাহলে কি আমরা ঈশা রায়কে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবো?

অপরাজিতা: না! শুধু একটু নজরে রাখুন, আমরাও নজরে রাখছি। কারণ আমরা শুধু ঈশা রায়কে সন্দেহ করছি, কিন্তু কেন সন্দেহ করছি সে ব্যাপারে আমরা কেউ স্পষ্ট নই।

সমরেশ: আর সবচেয়ে বড় কথা ২ জন ভিকটিম সুইসাইড করেছে।

আদিত্য: (খুব গম্ভীর ভাবে) কেসটা খুব জটিল হয়ে যাচ্ছে।

অপরাজিতা: (একটু হেঁসে) এটাও হতে পারে সবকিছুই কাকতালীয়। আমরা শুধু শুধু বেশি কিছু ভেবে নিচ্ছি। 

আদিত্য: (হেঁসে) এটাও হতে পারে মিস: চ্যাটার্জী। এবার ওঠা যাক। 

সমরেশ ও অপরাজিতা: (একসাথে) হ্যা! রাত হয়ে গেল। 

সমরেশ: থ্যাংক ইউ, আদিত্য বাবু! আমাদের সময় দেওয়ার জন্য। 

অপরাজিতা: থ্যাংক ইউ!

আদিত্য: (হাঁসি মুখে) ইওর মোস্ট ওয়েলকাম! আমি কোনো খবর পেলে আপনাদের অবশ্যই জানাবো। 

সেদিনকার মতো সবই সবাইকে বিদায় জানিয়ে রেস্তোরা ছেড়ে নিজেদের বাড়ির পথে রহনা দিলেন। সেদিন রাতে আদিত্য নস্করের মাথার মধ্যে সবকিছু জটলা বেঁধে যেতে থাকে।

তারপর কয়েক মাস কেটে গেছে। ২০২৪ সালের মার্চ মাসের একদিন সকালে অপরাজিতা ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখে চমকে উঠলেন। বিখ্যাত চিত্র পরিচালক অয়ন মুখার্জী মদ্যপ অবশ্যয় দমদমের ফ্লাট থেকে গভীর রাতে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। অপরাজিতা একটু পরে ২-১ জনকে ফোন করে জানতে পারেন অয়ন মুখার্জী কিছুদিন ধরে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। তিনি সেই কারণে হয়তো আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু অপরাজিতা যে ইনফরমেশন টা পেয়ে চমকে ওঠে সেটা হল, অয়ন মুখার্জী ‘ও ঈশা রায়ের কাছে থেরাপি নিতে যেতেন। অপরাজিতা দমদম থানায় ফোন করে জানতে পারে অয়ন মুখার্জী’র কেসটা বিধাননগর পুলিশ কমিশনার সত্যজিৎ দেবনাথ নিজে দেখছেন। অপরাজিতা সমরেশ বিশ্বাস এবং আদিত্য নস্কর কে সবকিছু জানায়। এবং নিজেদের মধ্যে পরিকল্পনা করে ৩ দিন পরে বিধাননগর পুলিশ কমিশনার সত্যজিৎ দেবনাথ এর সাথে ৩ জন দেখা করার জন্য রহনা দেয়।

অধ্যায় ৩: যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

২০২৩ সালের জানুয়ারী মাস। কলকাতার এক শীতের বিকেল। ধোঁয়াটে আকাশ, রাস্তার চায়ের দোকানে জমজমাট ভিড়, আর কুয়াশার ভিতর দিয়ে ধীরে ট্রাম চলার শব্দ।

সায়ন ঘোষ, মধ্য তিরিশের এক লেখক, গড়িয়াহাটের একটা ছোট্ট ক্যাফেতে বসে তার ডায়েরির খোলা পৃষ্ঠার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের সামনে কাগজের অক্ষরগুলো যেন তাকে ব্যঙ্গ করছিল—তার কলম আর নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারছে না।

সায়নের জীবনের প্রতিটা দিন এক রকম মনে হতে শুরু করেছে। তার প্রথম উপন্যাস “অরূপের প্রতিচ্ছবি” যখন বেস্টসেলার হয়েছিল, তখন তার নাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই জাদু মলিন হয়ে গেছে। এখন সে নিজের প্রতিভা হারিয়ে ফেলেছে বলে মনে করে।

সেদিন ক্যাফেতে বসে থাকা অবস্থায়, তার চোখে একটা বিজ্ঞাপন পড়ে। একটি মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা সভা—“মনের গভীর-অন্ধকারে প্রবেশ”। বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন ঈশা রায়, একজন খ্যাতনামা মনোবিদ। বিজ্ঞাপনটা পড়েই সায়নের মনে একটা অদ্ভুত কৌতূহল জাগে। সে ভাবল, এমন এক ব্যক্তির কথা শুনলে হয়তো তার নিজের মনের গভীর অন্ধকারের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাবে।

সেমিনারের ভেন্যু ছিল দক্ষিণ কলকাতার একটি অভিজাত অডিটোরিয়ামে। চমৎকার সাজসজ্জা, আর একদল মানুষের ব্যস্ততা। সায়ন ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে বসল। চারপাশে মানুষের মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনে হল, এখানে প্রত্যেকেই হয়তো নিজের অন্ধকারের উত্তর খুঁজতে এসেছে।

মঞ্চে প্রবেশ করলেন ঈশা রায়। তার চেহারায় এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। গাঢ় নীল রঙের শাড়ি, চোখে চশমা, আর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি। ঈশা যখন তার বক্তব্য শুরু করলেন, পুরো ঘরটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।

ঈশা: “আমরা সবাই মনে করি, আমাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়টা কাটিয়ে উঠেছি। কিন্তু সত্যি কি তাই? যখনই আমরা মনে করি, আর কোন বাধা নেই, এক অদৃশ্য অসুখ আমাদের মনকে আঘাত করে। আমরা কি কখনো নিজেদের মনকে পুরোপুরি বুঝতে পারি? এর উত্তর সহজ নয়। আমরা মাঝে মাঝে নিজেদের কষ্ট, অবিশ্বাস এবং ভয়কে দমন করে চলি, কিন্তু কখনো কি তাদের শেকড় বুঝতে পারি? জীবন যতোই এগিয়ে যাক, যতই আমরা শক্তিশালী হই, আমাদের অন্তর থেকে কিছু প্রশ্ন চিরকালই থেকে যায়। মনকে জানার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নিজের ভয়ের মুখোমুখি হওয়া। আসুন, সেদিকে তাকিয়ে আবার শুরু করি।”

তার প্রতিটি শব্দ সায়নের মনে গেঁথে যাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, ঈশা যেন ঠিক তার মনের কথা বলছে। সেমিনার শেষে, সায়ন ঠিক করল, ঈশার সঙ্গে দেখা করবে। ঈশা সেমিনার শেষে মঞ্চের পেছনের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিল। সায়ন সাহস করে সেখানে গেল। দরজায় নক করতেই ঈশা মাথা তুলে তাকাল।

ঈশা: “হ্যাঁ, বলুন?”

সায়ন: “আমি সায়ন ঘোষ। আমি একজন লেখক। আজকের সেমিনার আমার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।”

ঈশা তাকে বসতে বলল। তাদের কথোপকথন শুরু হল।

সায়ন: “আপনার কথাগুলো আমার খুব কাছের মনে হয়েছে। আমি বহুদিন ধরে জানেন; আমার লেখার জন্য একটি গভীর গল্প খুঁজছি। কিন্তু মনে হয় আমি নিজের ভেতরের অন্ধকারকেই এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।”

ঈশা গভীর দৃষ্টিতে তাকাল, যেন সে সায়নের মন পড়তে চাইছে। তারপর বলল,

ঈশা: “আমার মতে, আমরা নিজেরাই আমাদের গল্পের উৎস। আপনি কি কখনো নিজের জীবনকে সত্যিকার অর্থে দেখার চেষ্টা করেছেন?”

সায়ন একটু থমকে গেল। ঈশার কথাগুলো তাকে বিচলিত করছিল।

ঈশা: (হালকা হেসে) “আপনার যদি সময় থাকে, আমার ক্লিনিকে আসুন। আমরা এ নিয়ে আলোচনা করতে পারি।”

কথাটা শেষ করে ঈশা তার একটা ভিসিটিং কার্ড সায়ানকে দিল।

সায়ন: “ধন্যবাদ”

বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

এরপর সায়ন কয়েকদিন অপেক্ষা করল। কিন্তু তার মনের কৌতূহল তাকে শান্তি দিল না। একদিন সে ঈশার ক্লিনিকে গেলে। সেখানে তাদের দীর্ঘ আলোচনা হয়। ঈশা তার সঙ্গে তার নিজের জীবনের গল্প শেয়ার করল—কিভাবে সে ছোটবেলায় মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল, কিভাবে সেই অভিজ্ঞতা তাকে এই পেশা বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

সায়নও ধীরে ধীরে তার নিজের জীবনের যন্ত্রণার কথা বলতে শুরু করল। তার মধ্যেও ছিল এক গভীর ক্ষত। তারা দুজনেই বুঝতে পারল, তাদের জীবনের যন্ত্রণাগুলো যেন এক সূত্রে বাঁধা। ঈশা এবং সায়নের মধ্যে এক অদ্ভুত বন্ধন তৈরি হতে শুরু করল। তাদের আলাপচারিতা ক্রমে গভীর হয়ে উঠল। ওরা নিজেদেরকে “আপনি” থেকে “তুমি” বলে সম্মোধন করতে শুরু করলো। একদিন, ঈশা বলল,

ঈশা: “তুমি কি কখনো ভেবেছ, মানুষের মনে যে অন্ধকার থাকে, তা কি শুধু আলাপের মাধ্যমে বোঝা যায়? নাকি তার চেয়ে গভীর কিছু করা প্রয়োজন?”

সায়ন: “তোমার ইঙ্গিতটা ঠিক কীসের দিকে?”

ঈশা: (হেসে) “সেটা হয়তো সময়ই বলে দেবে।”

সেদিন সায়ন ক্লিনিক ছেড়ে বেরিয়ে গেল। সায়ন বেরিয়ে যাওয়ার আগে ইশাকে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে গেল, আর বললো সে পরে ইশার সাথে কথা বলে নেবে। ঈশা তার কথায় সম্মতি জানালো।

বরফ-হাঁসের উপহার - ছোটদের রূপকথার গল্প: বরফের দেশে মিশা ও তার বন্ধুদের সাহসী অভিযানে উপহার উদ্ধারের জাদুকরী কাহিনি। ছোটদের গল্প ও রূপকথার গল্প ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও উৎসবের আনন্দে ভরপুর। সম্পূর্ণ বাংলা ছোট গল্পটি পড়তে ও অডিও স্টোরির স্বাদ উপভোগ করতে এই লিংকটি ক্লিক করুন।

অধ্যায় ৪: দুইয়ে দুইয়ে চার হয়

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

ঈশাকে সায়ন যখন তার নিজের মোবাইল নম্বর দিচ্ছিল তখন ঈশা বলেছিল, তাকে ফোন করলে যেন রাত ১০ টার পর ফোন করে। কথামতো ২-৩ দিন পরে সায়ন একদিন রাতে ১০:৩০ টা নাগাদ সায়ন ইশাকে ফোন করে,

সায়ন: “হ্যাল্লো! ঈশা। আমি সায়ন বলছি, চিনতে পারছো?

ঈশা: “হ্যাঁ, বলো। কেমন আছো?”

সায়ন: “ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? এখন কথা বলা যাবে?”

ঈশা: “হুমম! ভালো আছি। বলো কি বলতে চাও?”

সায়ন: “আমি আমার পরের উপন্যাসটা নিয়ে একটু চিন্তায় আছি। নতুন কোন গল্পের প্লট আমার মাথায় আসছে না। তাই তোমার হেল্প দরকার…..”

ঈশা: (সায়নকে থামিয়ে দিয়ে) “কি ধরনের প্লট চাইছো? মাডার মিস্টিরি টাইপের?”

সায়ন: “হ্যাঁ!”

ঈশা: “আচ্ছা সায়ন, তোমার মন হয় না, আমাদের চারপাশে এমন কিছু কালপ্রিট ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের শাস্তি হওয়া উচিত? তারা নিজেদের ক্ষমতা ও টাকার জোরে আইনের হাত থেকে বেঁচে স্বাধীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে?”

সায়ন: “অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু কিভাবে?”

ঈশা: “আমরা চাইলেই করতে পারি।”

সায়ন: (একটু চমকে উঠে) “তুমি কি বলছো! মানে আমরা মাডা…..”

ঈশা: (থামিয়ে দিয়ে) “হুমম! তুমি ঠিক ধরেছো। দাড়াও আমি তোমাকে ফেস-টাইম এ কল করছি। এখানে কথা বলার অসুবিধা আছে।” 

তারপর ঈশা ফেস টাইম-এ সায়নকে কল করে। ঈশা বলতে শুরু করে,

ঈশা: “আমরা এরপর থেকে ফেস টাইম-এ কথা বলবো।”

সায়ন: “হুমম”

ঈশা: “আমরা থেরাপিস্টরা যেমন মানুষকে থেরাপি দিয়ে মনোরোগ থেকে বাঁচিয়ে তুলতে পারি তেমন তার বিপরীত ভাবে মানুষকে মৃত্যুর দিকেও ঠেলে দেওয়া যেতে পরে। মানে আমি বলতে চাইছি মানুষকে আত্মাহত্যার জন্য প্ররোচনা করার কথা। আমি আমার এই সংক্ষিপ্ত থেরাপিস্ট এর প্রফেশন-এ কোন দিন চেষ্টা করিনি। তবে এই জিনিসটা নিয়ে আমার নিজের প্রচুর উৎসাহ আছে। আর আমার এই উদ্দেশ্যকে সফল করতে আমার একজন তোমার মত লেখকের খুব দরকার ছিল। বিধাতা হয়তো সেটাই চেয়েছিল তার আমরা একে ওপরের সাথে মিলিত হয়েছি।”

সায়ন: “একটু ওয়েট কর। তোমার কথা শুনে আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। একটা ভালো করে হুস্কির পেগ বানিয়ে আনি। তুমি প্লিজ লাইনে থেকো।”

ঈশা: “তাহলে আমিও একটা বানিয়ে আনি। হুস্কির সাথে প্ল্যানিং খুব ভালো জমবে।”

ওরা কল ডিসকানেক্ট না করে মোবাইলটা রেখে পেগ বানাতে চলে গেল। একটু পরেই ওরা ফিরে এলো। ঈশা অনকল-এ চিয়ার্স করে বলতে শুরু করলো,

ঈশা: “কোন মানুষের যদি দুর্বল জায়গার বারবার আঘাত করা হয় তাহলে মানুষটি মানসিক ভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন মানুষটি আমাদের কাছে মানে একজন সাইকো-থেরাপিস্ট এর কাছে আসে। আমরা সেই দুর্বল জায়গা গুলো খুঁজে তাকে মানসিক ভাবে সুস্হতার দিকে নিয়ে যাই এবং তার মনকে পরিস্হিতির সঙ্গে লড়াই করার জন্য শক্তিশালী করে তুলি। কিন্তু আমাদের কেসে আমরা আমাদের টার্গেটকে থেরাপির মাধ্যমে; আসলে রিভার্স থেরাপির মাধ্যমে আরও দুর্বল করে তুলবো এবং তাকে আত্মহত্যার জন্য প্ররোচিত করবো। এবং আমার বিশ্বাস সে ঠিক আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে।”

সায়ন: (ইশাকে থামিয়ে বললো) “কিন্তু; আমার মনে দুটো প্রশ্ন আছে।

প্রথমে আমার নিজের এখানে কি ভূমিকা, আমি তো থেরাপিস্ট না।

দ্বিতীয় হচ্ছে, আমাদের টার্গেট তোমার কাছেই’বা কেন থেরাপি নিতে আসবে, আর তুমি কিভাবে সিওর হচ্ছো যে আমাদের টার্গেট থেরাপি নিতে চায়।”

ঈশা: “আসলে আমি আর তুমি ছাড়া আমাদের আরেকজনকে প্রয়োজন। একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট। আমরা তাকে ফ্রীলান্সার ওয়েবসাইট থেকে হাইয়ার করবো। প্রত্যেকবারের জন্য আলাদা আলাদা ফ্রীলান্সার। অন্য দেশ থেকে, যারা বাংলা বুঝতে পরে না।”

ঈশা একটু থেমে হুস্কির গ্লাসে চুমুক দিল। একটা সিগারেট ধরিয়ে আবার বলতে শুরু করলো,

ঈশা: “প্লানটা মন দিয়ে শোনো, তুমি প্রথমে আমার থেরাপি ক্লিনিকের ওপরে একটা এড্স স্ক্রিপ্ট লিখবে। যেটা মানুষকে খুব আকর্ষণ করবে। আমি ওই এড্স-এর ওপরে কয়েকটা ভিডিও বানাবো। আমি জানি তুমি সেটা খুব ভালো ভাবে পারবে। তারপর ওই এড্স আমাদের টার্গেট এলাকায় রাত ৯ টা থেকে ভোর ৩ টা পর্যন্ত চলবে। মানুষ সাধারণত ওই সময়টা একা মোবাইল নিয়ে থাকে। আমাদের এড্স গুগল সার্চ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর ইউ-টিউবে চলবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওই এড্স দেখে আমাদের টার্গেট’রা আমার কাছে থেরাপি নিতে আসবে। আমার থেরাপি সেশন গুলো সব গোপন ক্যামেরায় অডিও ভিডিও রেকর্ডিং করবো। তারপর সেশন কমপ্লিট হলে ওই ভিডিও রেকর্ডিং এর ওপরে ভিত্তি করে কিছু নেগেটিভ শর্টস ভিডিও বানাবে তারপর আমরা ওই শর্টস ভিডিওগুলো আমাদের টার্গেট-এর এলাকায় একই ভাবে এড্স চালাবো। আশা করি আমাদের এই পরিকল্পনা খুব কাজ করবে।”

সায়ন: “সব কিছুই বুঝলাম। কিন্তু এই সব কিছু প্ল্যান সামনা-সামনি বসে করলে ভালো হয়।”

ঈশা: “তাহলে একটা জায়গা খুঁজে বের করো।”

সায়ন: “তোমার যদি কোন আপ্পত্তি না থাকে তুমি কিছু দিন আমার ফ্ল্যাটে এসে থাকতে পারো, দেখো আমার’তো টু বি-এইচ-কে ফ্লাট তোমার কোন অসুবিধা হবে না। আমি এখানে একাই থাকি। এলাকাতেও নিরিবিলি, আমাদের কাজ করতে সুবিধা হবে।”

ঈশা: (একটু ভেবে বললো) “ঠিক আছে। আমি তোমার ফ্ল্যাটে থাকবো, যতদিন না আমাদের কাজ শেষ হয়। তুমি আমাকে লোকেশনটা পাঠিয়ে দাও আমি ৩-৪ দিনের মধ্যে তোমাকে ফোন করে আসছি।” 

কথাটা শেষ করে, দুজন দুজনকে গুড-নাইট জানিয়ে কল ডিসকানেক্ট করলো। ৫ দিন পড়ে ঈশা ৩-৪ টা বড় বড় লাগেজ নিয়ে সায়নের ফ্ল্যাটে উঠলো।

অধ্যায় ৫: আস্তিনের সাপ

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

কলকাতার গড়িয়াহাটের এক পুরনো ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে বসে চা খাচ্ছিল সায়ন এবং ঈশা। সন্ধ্যার ম্লান আলো, হালকা হাওয়া, আর দূরে ট্রামের ঘণ্টার শব্দ—সবকিছু যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি করছিল। তাদের কথোপকথন ঘুরছিল একটি বিশেষ বিষয়ের উপর।

সায়ন: (একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে) “তুমি নিশ্চিত, ঈশা?”

ঈশা: “পুরোপুরি, তোমাকে শুধু আমার নির্দেশ মেনে চলতে হবে। আমি খুঁজে বের করব আমাদের টার্গেটের মানসিক গঠন কেমন। আমরা যা চাই, তা করতে ও বাধ্য হবে।”

সায়ন কিছু না বলে ঈশার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই নারী যেন তার জীবনে এক নতুন অধ্যায় এনে দিয়েছে। তার জীবনের গতানুগতিকতা, তার সৃষ্টিশীলতার শূন্যতা—সবকিছুর উত্তর সে ঈশার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছে।

অরিন্দম বসু, একজন ধনী ব্যবসায়ী, যার রুক্ষ স্বভাব এবং অমানবিক আচরণ তাকে পরিচিত মহলে ভয়ঙ্কর করে তুলেছিল। তার কর্মচারীদের ওপর নিষ্ঠুরতা ছিল প্রায় কিংবদন্তিসম। ঈশার কাছে এই মানুষটি ছিল তার প্রথম “খেলা”র আদর্শ লক্ষ্য। সায়নের কাছে এই পদ্ধতিটা অবিশ্বাস্য শোনালেও, ঈশার প্রতি তার অগাধ আস্থা ছিল।

পরিকল্পনা মত ওরা এড্স চালায়। এড্স দেখে অরিন্দম একটি থেরাপি সেশনের প্রস্তাব দিয়ে ইশার সঙ্গে যোগাযোগ করল। বিশেষ করে তার সুনাম সম্পর্কে জানার পর, অরিন্দম রাজি হয়ে গেল। তার ধারণা ছিল, মনোবিদের সাহায্যে হয়তো সে তার উদ্বেগ এবং দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাবে।

সেশনের প্রথম দিনেই ঈশা অরিন্দমের মানসিক দুর্বলতাগুলি খুঁজে বের করল। তার গলায় ছিল এক অদ্ভুত মায়া, যা অরিন্দমকে ধীরে ধীরে তার সমস্ত গোপন কথা বলতে বাধ্য করল। থেরাপির প্রথম দিনে ঈশা যেন অরিন্দমকে হিপনোটাইজ করে ফেলেছিল। ঈশা দেখতে খুব’ই সুন্দর। সেটাও থেরাপি সেশনে অরিন্দমকে ইশার প্রতি মোহিত করে তুলেছিল। ঈশার চোখে ছিল এক ধরনের শান্ত কিন্তু দৃঢ়তা, যেন সে জানতো কীভাবে অরিন্দমকে তার অন্ধকারে টেনে আনবে। সেশনের ঘরটি নীরব ছিল, শুধু মাঝে মাঝে ঘড়ির শব্দ কাঁপছিল।

ঈশা: (ধীরে ধীরে প্রশ্ন করল) “তোমার জীবনে কি এমন কিছু আছে, যা তোমার রাতে ঘুমোতে দেয় না?”

অরিন্দম: (কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, গলায় বিষণ্ণতা) “হ্যাঁ, আছে। আমার মনে হয়, আমি আমার জীবনটা শুধু টাকার পেছনে ছুটেই নষ্ট করেছি।”

ঈশা: “টাকা কি সবসময় সুখ দেয়?”

অরিন্দম: (একটু থমকে) “আমি জানি না। কখনও কখনও মনে হয়, টাকার পেছনে ছুটতে ছুটতে আমি আমার জীবনটাই হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু একসঙ্গে এত কিছু অর্জন করেও কোথাও কিছু একটা খুঁজে পাচ্ছি না।”

ঈশা: “তাহলে তুমি কি মনে করো, তুমি সত্যিই সুখী?” 

অরিন্দম: “না, আমি সুখী নই। আমি জানি না কিভাবে সুখী হতে হয়। শুধু কাজ, কাজ আর কাজ। মনে হয়, জীবনের একটা নির্দিষ্ট দিকেই আমি আটকে গেছি।”

ঈশা: “তুমি কি কখনো তোমার কর্মচারীদের কষ্টের কথা ভেবে দেখেছ?”

অরিন্দম একটু থমকে গেল। তার মুখ থেকে কোন উত্তর আসল না। ঈশা আবার বলল,

ঈশা: “তুমি কি মনে করো, তাদের ওপর তোমার অমানবিক আচরণ সঠিক ছিল?”

অরিন্দম: “হ্যাঁ, আমি জানি না, কী হয়েছিল। আমি শুধু জানতাম, আমি যা করেছি, তা ব্যবসার জন্য প্রয়োজন ছিল।”

ঈশা: (শান্ত সুরে) “তবে কি তোমার মনে হয়, অন্যদের কষ্টের বিনিময়ে তুমি শুধু নিজের লাভটাই দেখলে?”

অরিন্দম ভীষণ দ্বিধান্বিত হয়ে উঠল। তার চোখে ঘুম নেই, খাবারে স্বাদ নেই। তার মনে হতে লাগল, সে তার চারপাশে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছে, যা এখন তাকে শ্বাসরোধ করছে। ঈশা আরো গভীরে প্রবেশ করতে চাইল।

ঈশা: “যখন তুমি কর্মচারীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করেছিলে, তখন তোমার মনে কোনো ক্ষোভ ছিল?”

অরিন্দম: “হ্যাঁ, ছিল। আমি জানতাম তারা কাজ করতে জানে না। কিন্তু আমি তাদের এত কিছু শিখিয়ে দিয়েও, মনে হয়েছিল তারা কখনোই আমার মানদণ্ডের প্রতি আগ্রহী নয়।”

ঈশা: (একটু মৃদু হাসল) “তাহলে তুমি কি মনে করো, তারা শুধুই তোমার অধীনস্থ? তাদের কোনো অনুভূতি, কোনো প্রয়োজন নেই?”

অরিন্দম: “কখনও কখনও মনে হয়, আমি শুধু সফল হতে চাইছিলাম। কিন্তু এখন, তুমি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো, আমি জানি না আমি কী চেয়েছি।”

ঈশা: “তোমার জীবন কি তোমার নিজের কাছে অর্থবহ মনে হয়? যদি না হয়, তবে তার পরিবর্তনের দায় কার?”

এই প্রশ্নটা যেন অরিন্দমের মনে একটি বিষাক্ত বীজ বপন করল। সে পুরো রাত এই কথাগুলো ভেবে কাটাল। তার অপরাধবোধ তাকে গ্রাস করছিল। ঈশা একটানা তার অনুভূতিগুলোর দিকে আঙুল তুলতে শুরু করেছিল, আর অরিন্দম ক্রমশ ভেঙে পড়ছিল। ঈশার প্রতিটি প্রশ্ন ছিল যেন তার আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দেয়, আর অরিন্দম সেই দরজার পেছনে মৃদু সুরে গুটিয়ে যাচ্ছিল।

সেদিন রাতে অরিন্দমের ১৪ বাছারের মেয়ে রিতিকা ডিনার টেবিলে বসে অরিন্দমকে একটা ভিডিও দেখায়। ওটা একটা শর্টস ভিডিও ছিল। আসলে ওই ভিডিও টা ঈশা ও সায়নের এড্স ভিডিও। ভিডিওটিতে দেখাচ্ছিল, “একজন কপট লোভি ব্যবসায়ী কিভাবে টাকার লোভে তার নিজের স্ত্রী ও মেয়েকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। শেষে ওর মেয়ে মারা যায়। ভিডিওটির শেষে সঞ্চালক বলছিল, এই রকম লোভী মানুষদের এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা উচিত না।” ভিডিওটি শেষ হতে রিতিকা বলে ওঠে,

রিতিকা: “বাবা তুমি খুব ভালো, এই রকম নিষ্ঠুর না। আমি তোমাকে আর মাকে খুব ভালোবাসি।”

অরিন্দম কিছু না বলে খেয়ে উঠে চুপচাপ শুয়ে পড়লো। ওর মনে যেন চরম অপরাধ বোধ কাজ করছিল। পরবর্তী আরও কয়েকটা সেশনে ঈশা তার মনোযোগ আরো গভীরভাবে প্রবেশ করাল।

ঈশা: “তুমি কি মনে করো, তোমার ব্যবসায়িক নীতি ছিল সঠিক? নাকি তুমি কিছু মানুষের ওপর নির্দয় হয়ে তাদের স্বপ্ন, তাদের মানবিকতাকে চুরমার করে দিয়েছ?”

অরিন্দম চোখ বন্ধ করে বসে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, ঈশার কথা একে একে তার মনে তোলপাড় সৃষ্টি করছে।  সঙ্গে রাতে তার মেয়ে রিতিকার কথাও খুব মনে পারছিলো,

রিতিকা: “বাবা তুমি খুব ভালো, এই রকম নিষ্ঠুর না….”

কথাটা বার বার কানে বাজছিল। ঈশা ওর চারিত্রিক ব্যবহার খুব নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। অরিন্দম-এর মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করছিল। অরিন্দম কে কিছু বুঝতে না দিয়ে ঈশা মৃদু হাসল,

ঈশা: “তোমার সফলতা কি জীবনের মূল লক্ষ্য হতে পারে, না কি মানুষের হৃদয়ের কাছে সাফল্যের মানে অন্য কিছু?” 

অরিন্দম: “আমি জানি না।”

ঈশা: “আমরা কখনোই ভাবি না, আমাদের সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব কি মানুষের ওপর কতটা গভীর হতে পারে। তুমি কি কখনো বুঝতে পারো, তোমার কাজের মধ্যে কতটা অন্ধকার ছিল?”

অরিন্দম আর এক মুহূর্তও ধরে রাখতে পারল না। তার চোখে জল চলে এলো, এবং সে বলল, 

অরিন্দম: “আমি জানি না ঈশা, আমি এখন কী করতে পারি। আমি নিজের মধ্যে এক ধরনের খালি অনুভব করছি। আমি জানি না কী করে নিজেকে সংশোধন করব।”

ঈশা: (শান্তভাবে) “এটাই শুরু। যদি তুমি নিজেদের ভুল বুঝে নিতে পারো, তবে তুমি তোমার জীবনকে পরিবর্তন করতে পারবে। তবে এটা তোমাকে মাথায় রাখতে হবে যে তোমার এই কুকর্মের কথা যেন পরিবারের কেউ জানতে না পারে। আমার থেরাপিস্ট প্রফেশন-এ আমি এই রকম কিছু কেস পেয়েছিলাম যেখানে একজন প্রেসেন্টের ফ্যামিলি তার দুস্কর্মের কথা জানতে পেরে যায় তার পর তার স্ত্রী ও সন্তান তাকে ছেড়ে চলে যায়। পরে সেই পেসেন্টটি আত্মহত্যা করে।”

এখানে সেশনের শেষ হয়। ঈশা বুঝতে পারছিল, অরিন্দম আস্তে আস্তে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠছিল। ইশার মন আনন্দে পুলকিত হয়ে গেল। ঈশা বুঝতে পারছিল তাদের প্ল্যান ঠিক ঠিক কাজ করছিল।

সেদিন রাতে অরিন্দম ঠিক মত ঘুমাতে পারলো না।  নিজের মধ্যে প্রচুর অপরাধ বোধ কাজ করছিল। রাত ১ টার দিকে দেখে বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে গেছে সে বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রিজ থেকে মদের বোতলটা বের করে বারান্দায় চলে এলো। বারান্দায় বসে একা একা মদ আর সিগারেট খেতে লাগল। হাতে মোবাইলটা নিয়ে ইউ-টিউবে শর্টস দেখতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর পর ঈশা আর সায়নের এড্স এর শর্টস গুলো আসতে লাগলো। ভিডিও গুলো দেখতে ওর মন আরও অনুশোচনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। রাত্রি ৩ টা নাগাদ সে ঘুমাতে গেল। পরের দিন অফিস-এ একটু দেরি করেই পৌঁছেছিল। অফিস পৌঁছে দেখে তার অফিসের একজন স্টাফ এর পদত্যাগ পত্র তার টেবিলে পড়ে আছে। পদত্যাগ পত্রটি পড়ে অরিন্দম নিজেকেই দোষারোপ করছিলো। আসলে ওই কর্মচারীকে সায়ন তার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করে অন্য একটা কোম্পানিতে বেশি বেতনের চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। 

সেদিন অনেক রাত করে অরিন্দম বাড়ি ফিরলো। সে নেশায় চুর হয়ে ছিল।  পরের দিন সকালে খবর এল, অরিন্দম বসু তার নিজের বাড়িতে একটি চিঠি লিখে আত্মহত্যা করেছে।

পরেরদিন দুপুরে ইশার কাছে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে। 

ঈশা: হ্যালো!

সমরেশ: হ্যালো! ঈশা রায় কথা বলছেন?

ঈশা: হ্যা! বলছি। কে বলছেন?

সমরেশ: আমি সাব ইন্সপেক্টর সমরেশ বিশ্বাস, গড়িয়াহাট থানা। আপনার একজন প্রেসেন্ট, অরিন্দম বসু কাল রাতে সুইসাইড করেছেন। ওই ব্যাপারে আপনার সাথে কিছু কথা ছিল। 

ঈশা: (একটু চমকে গিয়ে) আপনি এ কি বলছেন? আমি কি এখন থানায় আসবো?

সমরেশ: না! এখন আসার দরকার নেই। শুধু আমাকে এইটুকু বলুন, উনি কি ধরণের মানসিক রোগে ভুগছিলেন?

ঈশা: অরিন্দম বসু, একজন ধনী ব্যবসায়ী, যার রুক্ষ স্বভাব এবং অমানবিক আচরণ তাকে পরিচিত মহলে ভয়ঙ্কর করে তুলেছিল। তার কর্মচারীদের ওপর নিষ্ঠুরতা ছিল প্রায় কিংবদন্তিসম। কিন্তু উনার ওই আচরণের জন্য উনি আত্মগ্লানিতে ভুগছিলেন। সেই জন্য উনি প্রচুর ড্রিংক করতেন। আমার থেরাপি সেসন এ ২-৩ বার উনি রেগেও গিয়েছিলেন। কিন্তু উনার আচরণে আমার কখনো মনে হয়নি যে উনি আত্মহত্যা করবেন।

সমরেশ: ধন্যবাদ! আমাদের ইনভেস্টিগেশন এ আবার যদি প্রয়োজন হয় তাহলে আমি আপনাকে আবার ফোন করবো অথবা আপনাকে থানায় দেখে নেবো। 

ঈশা: অবশ্যই! আমি আপনাদের এই ইনভেস্টিগেশন এ সাহায্য করার জন্য কথা সাধ্য চেষ্টা করবো। 

সমরেশ: ওকে, এখন তাহলে ফোন রাখছি। 

ঈশা: ওকে..বাই!

সায়ন ইশার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে ইশার মুখের দিকে তাকালো। ইশার চেহারায় চিন্তা ও আনন্দ ‘র ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো। সে ইশাকে জিজ্ঞেসা করলো,

সায়ন: কার ফোন ছিল?

ঈশা: গড়িয়াহাট থানা থেকে সাব ইন্সপেক্টর সমরেশ বিশ্বাস। অরিন্দম বসু গতকাল রাতে সুইসাইড করেছে। 

পুলিশের কথা শুনে সায়ন একটু চমকে গেল। কিন্তু ঈশা সায়ন’এর হাত ধরে তাকে ভরসা দিল যে কোনো অসুবিধা নেই। পুলিশের এটা রুটিন কল ছিল। কিন্তু দুজনের চেহারায় খুশি আর বিস্ময়ের এক মিশ্র আবেগ দেখা গেল।

সায়ন: “ঈশা! আমরা কি ঠিক পথে এগোচ্ছি?”

ঈশা: (ঠান্ডা হাসি) “সে যা করেছে, তার পরিণতি ভোগ করেছে। আমাদের কাজ শুধু সেটাকে কার্যকর করা।”

ঈশা তার ডায়েরি খুলে একটি নাম লিখল, অমল ঘোষ। সায়ন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,

সায়ন: “নতুন লক্ষ্য?”

ঈশা: “প্রতিটা অপরাধীরই একদিন তার অন্ধকারের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা শুধু তাদের সামনে আয়না ধরার কাজটা করছি।”

অমল ঘোষ, একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যে নকল ওষুধের কারবার চালিয়ে বহু মানুষের জীবন ধ্বংস করেছেন। তার প্রতারণার জালে আটকে অসংখ্য সাধারণ মানুষ তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। এই নামটাই তাদের পরবর্তী লক্ষ্য। ঈশা ও সায়ন তাদের পরিকল্পনা মতো অমল ঘোষকে নিজেদের জালে ফেলে ও তাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়। ঠিক একই ভাবে ওদের পরের টার্গেট হয় বিখ্যাত চিত্র পরিচালক অয়ন মুখার্জী যে মহিলাদের সিনেমায় সুযোগ দেওয়ার নাম করে শোষণ করতেন।

অধ্যায় ৬: কান টানলে মাথা আসে

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

২০২৪ সালের মার্চ মাস, বর্তমান সময়, বিধাননগর পুলিশ কমিশনার এর অফিস।

সমরেশ বিশ্বাস, অপরাজিতা চ্যাটার্জী কে নিয়ে ওখানে পৌঁছে গেছেন। উনারা আদিত্য নস্কর এর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিছুক্ষনের মধ্যে আদিত্য নস্কর ও ওখানে পৌঁছান। ৩ জন অফিস এর রিসেপশন এ গিয়ে কমিশনার সত্যজিৎ দেবনাথ এর সঙ্গে একসাথে দেখা করতে চান।

(ইন্টারকানেক্টেড ফোনে নম্বর ডায়াল করে) “স্যার! গড়িয়াহাট থানার ২ জন সাব ইন্সপেক্টর এবং সল্টলেক থানার একজন সাব ইন্সপেক্টর আপনারা সাথে দেখা করতে চান। খুব আর্জেন্ট বলছেন, উনারা চিত্র পরিচালক অয়ন মুখার্জী এর সুইসাইড কেস নিয়ে কথা বলতে চান।”

সত্যজিৎ: তিন জন একসাথে?

Constable (Female / Receptionist): ইয়াস স্যার!

সত্যজিৎ: (একটু চিন্তিত সুরে) আচ্ছা, ভেতরে আসতে বলুন।

সমরেশ সত্যজিৎ দেবনাথ এর কেবিনের দরজাটা একটু খুলে বললেন,

সমরেশ: মে উয়ি কাম-ইন স্যার? 

সত্যজিৎ: ইয়াস! কাম-ইন!

তিনজন কনিশানারের কেবিনে প্রবেশ করলো 

তিনজন একসাথে: (স্যালুট করে) জয় হিন্দ স্যার!

সত্যজিৎ: জয় হিন্দ! বসুন, চা খাবেন?

আদিত্য: নো! থ্যাংক ইউ স্যার!

সত্যজিৎ: বলুন… কি বলবেন? 

সমরেশ: স্যার আমি গড়িয়াহাট থানার সাব ইন্সপেক্টর সমরেশ বিশ্বাস, ইনি আমার থানার’র একজন সাব ইন্সপেক্টর অপরাজিতা চ্যাটার্জী। আজ থেকে বছর খানিক আগে আমাদের এলাকায় অরিন্দম বসু নামে একজন ব্যবসায়ী আত্মহত্যা করেন। তিনি আত্মহত্যা’র কিছুদিন আগে থেকে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। সেই কারণে উনি ঈশা রায় নামে একজন সকলোজিস্ট এর কাছে থেরাপি নিতে শুরু করেন…..

সত্যজিৎ: (সমরেশ কে থামিয়ে) সাকোলোজিস্ট-এর নাম কি বললেন, ঈ….শা… রায়…..।

সমরেশ: ইয়াস স্যার! ঈশা রায়। (আদিত্য নস্করের দিকে তাকিয়ে) আদিত্য বাবু আপনি বলুন। 

আদিত্য: গড়িয়াহাট থানার ওই ঘটনার ৫-৬ মাস পর আমাদের থানায় একটা সুইসাইড কেস আসে, বিখ্যাত ওষুধ ব্যবসায়ী অমল ঘোষ বিষ খেয়ে আত্বহত্যা করেন। উনিও মানসিক অবস্বাদে ভুগছিলেন এবং এই ঈশা রায়ের কাছে থেরাপি নিতে শুরু করেছিলেন। তারপর আমরা চিত্র পরিচালক অয়ন মুখার্জী এর সুইসাইড কেস-এর কথা জানতে পারি। 

সত্যজিৎ: ইন্টারেষ্টিং! আচ্ছা এই অমল ঘোষ আর অরিন্দম বসু এর মধ্যে কোনো কানেকশন ছিল? আপনারা এই ব্যাপারে কিছু ইনভেস্টিগেশন করেছেন?

অপরাজিতা: স্যার! আমরা আমাদের সোর্স লাগিয়ে সেটা জানতে চেয়ে ছিলাম; কিন্তু অমল ঘোষ আর অরিন্দম বসু এর মধ্যে কোনো কানেকশন খুঁজে পাইনি।

সত্যজিৎ: আর ওই সাইকোলজিস্ট ঈশা রায়ের ব্যাপারে?

সমরেশ: মিস: রায় গড়িয়াহাট সায়ন ঘোষ নামে একজন লেখকের ফ্ল্যাটে থাকেন। তবে ওরা বিবাহিত নয়। আর এর বেশি কিছু বলতে পারবো না। 

সত্যজিৎ: আপনাদের মধ্যে কেউ ঈশা রায় কে জেরা করেছেন?

আদিত্য: নো স্যার! আসলে জেরা করার কোনো কারণ খুঁজে পাইনি। আর ওই দুটো সুইসাইড কেস ছিল।  আমাদের কাছে ঈশা রায় কে জেরা করার জন্য কোনো কারণ ছিল না। 

সত্যজিৎ: গুড! মিস: চ্যাটার্জী আপনার কি মনে হয় এই সুইসাইড এর পেছনে ঈশা রায় থাকতে পারেন?

অপরাজিতা: থাকতেও পারে। কিন্তু আমি বা আমরা ঠিক কন্ফার্ম হতে পারছি না।

সত্যজিৎ: আমাদের একজন ক্রিমিনোলোজিস্ট এর সাহায্যের দরকার আছে।

অপরাজিতা: স্যার! আমি ক্রিমিনোলজি নিয়ে পড়াশোনা করেছি।

সত্যজিৎ: ভেরি গুড! তাহলে আপনি আপাতত বাকি সব কাজ সমরেশ বাবু কে হ্যান্ড ওভার করে এই কাজে লেগে পড়ুন। আর আদিত্য বাবুকে কাজের আপডেট দেবেন। আমি আপনাদের কমিশনারের সাথে কথা বলে নেবো। 

অপরাজিতা: ওকে স্যার! আই উইল!

সত্যজিৎ: আদিত্য বাবু আপনি কাল থেকে এখানে রিপোর্ট করবেন। আর সমরেশ বাবু আপনি আপাতত গড়িয়াহাট থানায় থাকুন আর সায়ন এবং ইশার ওপর নজরদারি বাড়ান। আর আদিত্য বাবুকে আপডেট দেবেন। 

সমরেশ ও আদিত্য একসাথে: ওকে স্যার!

সত্যজিৎ: তাহলে আজকে আপনারা আসুন! বাই দা ওয়ে, থাঙ্কস টু অল!

তিনজন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। একসাথে স্যালুট করে কমিশনার অফিস থেকে বেরিয়ে যায়। 

অধ্যায় ৭: যত বড় মাছ, তত বড় কাঁটা

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

কলকাতার বালিগঞ্জে অবস্থিত একটি রাজনৈতিক অফিস বিল্ডিংয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে ঈশা আর সায়ন।

ঈশা: (গলায় কৌতূহল আর এক ধরনের কঠোরতার মিশ্রণ) “এই লোকটা আগের তিনটের চেয়েও ভয়ঙ্কর।”

সায়ন: “হ্যাঁ, অর্জুন সেন। একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। ঘুষ, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, আর অপরাধীদের রক্ষা করা—সবকিছুই তার হাতের কাজ। কিন্তু আমরা এটা কীভাবে করব? রাজনীতিবিদরা তো সহজে নিজেদের ভুল স্বীকার করবে না।”

ঈশা: “মানুষ যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তার কিছু না কিছু দুর্বলতা থাকেই, আমার কাজ সেই দুর্বলতা খুঁজে বের করা।”

অর্জুন সেন, মধ্য বয়সী এক রাজনীতিবিদ। তিনি রাজ্যজুড়ে পরিচিত। তার চতুর কথাবার্তা আর প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব তাকে জনগণের মাঝে জনপ্রিয় করে তুলেছিল, কিন্তু তার পর্দার আড়ালের কাজকর্ম ছিল ভয়ানক। ঈশার কাছে সে ছিল আদর্শ চতুর্থ লক্ষ্য।

সায়ন তার ডায়েরি খুলে ‘অর্জুন’ সম্পর্কে তথ্য লিপিবদ্ধ করতে শুরু করল। তার চোখে এক ধরনের উত্তেজনা, যেন একটি নতুন গল্পের জন্ম হতে চলেছে।

সায়ন অর্জুন সেনের দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করতে দিনরাত পরিশ্রম করতে লাগল। তার লক্ষ্য ছিল, এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে যে অর্জুনের সাথে ইশার যোগাযোগ করিয়ে দেবে। অনেক খোঁজার পথে সায়ন জানতে পারল অর্জুনের সবথেকে বিশ্বস্ত এবং কাছের মানুষ শেখরের ব্যাপারে। শেখর শুধু অর্জুনের ডানহাত নয়, তার অনেক গোপন কাজের সহযোগীও। তবে শেখরের একটা দুর্বলতা ছিল—সুন্দরী মহিলাদের প্রতি তার অসীম আকর্ষণ। 

এই তথ্য সায়ন ইশাকে জানাল। ইশা খুব মন দিয়ে শুনল এবং পরের পদক্ষেপ কী হতে পারে তা ভাবতে শুরু করল। শেখরের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অর্জুনের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে প্রবেশ করার একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। ইশা সিদ্ধান্ত নিল, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে শেখরের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে। 

ইশা তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ফেসবুকে শেখরকে একটি বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠাল। দুদিনের মধ্যেই শেখর সেই অনুরোধ গ্রহণ করল। শেখর ধীরে ধীরে ইশার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। তার মিষ্টি কথা এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব শেখরের মন জয় করতে বেশি সময় লাগল না। কথা বলতে বলতে শেখর নিজের কাজ এবং অর্জুন সেনের বিষয়ে অনেক কিছু প্রকাশ করতে লাগল। ইশা একজন মনস্তত্ত্ববিদ হওয়ার সুবাদে সে ভালো করেই জানতো কি’করে তথ্য বের করতে হয় এবং তা’ও শেখরের মতো একজন চুনো-পুঁঠির কাছ থেকে। 

ইশা’ও শেখরের কাছ থাকে জানতে পারে অর্জুন সেন মাঝে মাঝে খুব ইমোশনাল হয়ে পড়ে, মানসিক অবসাদ আছে। ইশা ঠিক এই জায়গাটা খুঁজছিল, সে শেখারকে বলল অর্জুন সেনকে নিয়ে তার ক্লিনিকে নিয়ে আসার জন্য। শেখরের প্রস্তাবে অর্জুন সেন প্রথমে বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান ছিল, কিন্তু নিজের মানসিক শান্তির জন্য রাজি হয়ে গেল। অবশেষে অর্জুন সেন উপস্হিত হলো ইশার ক্লিনিকে।

প্রথম সেশনেই ঈশা তার গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দিয়ে বুঝতে পারল যে অর্জুন বাইরে থেকে যতটাই কঠোর দেখাক, ভেতরে সে ততটাই ভঙ্গুর। তার কথা থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল যে, ক্ষমতার মোহ আর নিজের স্বার্থপরতা তাকে একা করে তুলেছে। প্রথম দিনের থেরাপি সেসন শুরু হল, সহজ এবং সাধারণ কিছু প্রশ্ন দিয়ে। 

ইশার লক্ষ্য ছিল অর্জুনের মনোভাব এবং জীবনের পটভূমি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি করা। 

ইশা: “আপনার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?”

অর্জুন: (সামান্য হেসে) “ছোটবেলায় বাবা গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন। উনার কাজ দেখে রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। আমি যখন প্রথমবার নির্বাচনে দাঁড়াই, তখন আমার বয়স মাত্র তিরিশ।”

ইশা: “আপনার পরিবার আপনার এই সিদ্ধান্তে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল?” 

অর্জুন: (কিছুক্ষণ চুপ থেকে) “আমার স্ত্রী আমাকে সবসময় সমর্থন করেছে। কিন্তু আমার সন্তানরা… আমি তাদের জন্য সময় দিতে পারিনি। আমার ব্যস্ততার জন্য আমাদের সম্পর্কটা একটু দূরত্বে চলে গেছে।”

ইশা: “আপনার সাধারণ মানুষের প্রতি আচরণ কেমন ছিল বলে আপনি মনে করেন?”

অর্জুন: (মুচকি হেসে) “আমি তো সবসময় বলি, মানুষের সেবা করাই আমার জীবনের উদ্দেশ্য। তবে… রাজনীতিতে অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে আপস করতে হয়।” 

ইশা বুঝতে পারছিল অর্জুনের কথায় সত্যের চেয়ে অজুহাতের পরিমাণ বেশি। কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করল না। কথোপকথনের প্রতিটি বিন্দু থেকে অর্জুনের ভেতরের দ্বন্দ্ব এবং অপরাধবোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।

ঈশা: (শান্ত স্বরে) “অর্জুনবাবু, সাথে কথা বলে বোঝা যায় আপনি অত্যন্ত প্রভাবশালী মানুষ। কিন্তু আপনার ব্যক্তিগত জীবনে কি এমন কিছু আছে, যা আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলে?”

অর্জুন প্রথমে হেসে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল।

অর্জুন: “অস্বস্তি? না, আমার জীবনে সব ঠিকঠাক চলছে। ব্যস্ততা তো আছেই, কিন্তু… সেটাই স্বাভাবিক।”

ঈশা: “তাহলে কি বলবেন যে, আপনার জীবনের প্রতিটি কাজ আপনি সঠিক মনে করেই করেছেন?”

অর্জুন: (একটু থেমে) “সঠিক-ভুল নিয়ে চিন্তা করার সময়ই বা কোথায়? জীবনে শুধু এগিয়ে যেতে হয়।”

ঈশা: “তাহলে কি এগিয়ে যাওয়ার জন্য কখনো এমন কিছু করেছেন, যা অন্যের ক্ষতি করেছে?”

অর্জুন: (এই প্রশ্ন এড়ানোর চেষ্টা করেছিল) “রাজনীতি খুব জটিল জায়গা। সবাইকে’তো আর খুশি রাখা সম্ভব নয়।”

অর্জুন সেনের সঙ্গে সেদিন দীর্ঘসময় ধরে কথা বলার পর, ইশা বুঝতে পারল যে তার ভেতরের জটিলতা এত সহজে প্রকাশ পাবে না। সেশনের শেষ দিকে ইশা শান্ত কণ্ঠে বলল,

ইশা: “আজকের জন্য আমরা এখানে শেষ করছি। তবে আমি চাই, আপনি পরবর্তী সেশনে নিজের কিছু অভিজ্ঞতা আমার সাথে শেয়ার করুন; বিশেষত এমন কিছু ঘটনা, যা আপনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।” 

অর্জুন: “দেখি। চেষ্টা করব।”

ইশা: (মৃদু হাসি) “আপনার ভেতরে অনেক প্রশ্ন এবং দ্বন্দ্ব আছে, অর্জুনবাবু। আমি চাই আপনি এই সেশনের বাইরে সময় নিয়ে নিজের উপর একটু চিন্তা করুন। এটা আপনাকে সাহায্য করবে।” 

অর্জুন কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ উঠে দাঁড়াল। তার চোখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ছিল। দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে হঠাৎ পেছন ফিরে বলল,

অর্জুন: “আপনি কি মনে করেন, সত্যি সত্যি মানুষ বদলাতে পারে?”

ইশা: (শান্তভাবে) “হ্যাঁ, বদলাতে পারে। তবে তার জন্য ইচ্ছা আর সাহস দুটোই দরকার।” 

অর্জুন কিছু না বলে বাইরে বেরিয়ে গেল। ইশা তার চেয়ার থেকে উঠল না। অর্জুনের প্রতিটি প্রতিক্রিয়া সে মনে মনে বিশ্লেষণ করতে থাকল। সেদিন রাতে সায়ন ও ইশা অর্জুন সেনের ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করলো। ইশা বলে উঠলো,

ইশা: “এ গভীর জলের মাছ, তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে না।”

সায়ন: (একটা সিগারেট ধরিয়ে) “আমাদের একটু অন্য ভাবে ব্যাপারটা দেখতে হবে। দেখি কি করা যায়।”

অধ্যায় ৮: গভীর জলের মাছ

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

সেদিন রাতে ওরা ওদের পরিকল্পনা মত সর্টস ভিডিও এডস চালায়। কিন্তু তারা এই কেসে খুব সন্দেহে ছিল এই ভাবে তারা অর্জুন সেনকে নিজেদের জালে আটকাতে পারবে না। সায়ন ও ইশা খুব চিন্তায় ছিল। ওরা নতুন নতুন পরিকল্পনা করতে লাগলো। সেদিন রাতে ওরা প্রথম সেশন’এর ভিডিওটি বার বার দেখতে লাগল। ঈশা’ও নাছোড়বান্দা ছিল। রাতে ডিনারের সময় ইশা বলে উঠল,

ইশা: “যদি আমাদের পরিকল্পনা মত কাজ না হয় তাহলে আমরা মেডিসিন ইউজ করতে পারি।”

সায়ন: (সন্দেহ) “এটা সম্ভব?”

ইশা: “সম্ভব।”

কয়েকদিন পর অর্জুন সেন আবার ইশার কাছে থেরাপি সেশন-এ এলো। প্রথমে কিছু সাধারন কথাবার্তার পর। ইশা জিজ্ঞেস করল,

ইশা: “আপনি ড্রিংক করেন?”

অর্জুন: “হুমম।”

ইশা: “আমাকে একটু এই ব্যাপারে খুলে বলুন, মানে প্রত্যেকদিন না মাঝে মাঝে, বাড়িতে না বাইরে।”

অর্জুন: (একটু অবাক) “আমি প্রায় প্রতিদিন রাতে ড্রিংক করি, আমাদের বাড়ির ছাদে একা বসেই করি। আমার একা বসে ড্রিংক করতে ভালো লাগে। মানে, একটু নিজের সাথে একান্তে সময় কাটানো।”

ঈশা: “রাতে ঘুমাতে পারেন?”

অর্জুন: “ঘুম ভালো আসে না। সময়-সময় মনে হয় কেউ যেন আমার পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। সেই জন্য আমি রাতে ড্রিংক করি।”

ঈশা: “আপনি নিজেই নিজের ছায়া হয়ে গেছেন। নিজের আয়নায় নিজের সত্যিকারের চেহারা দেখতে ভয় পাচ্ছেন।”

অর্জুন: (অসহায়ভাবে) “হয়তো… আমি জানি। কিন্তু আমি কী করব? সব কিছু ঠিক করা কি সম্ভব?”

ঈশা: (শান্ত স্বরে) “প্রথমে নিজে স্বীকার করুন, যে আপনি ক্ষমতার লোভে যা করছেন তা আপনার করা উচিত না। নিজের ভুল বুঝুন। সত্যের মুখোমুখি হন। নিজে আয়নায় তাকান।”

এভাবে সেদিনকার মত সেশন শেষ হল। অর্জুন সেন ক্লিনিকে থেকে বেরিয়ে যাবে ওই সময় ইশা তাকে ডেকে বলল,

ঈশা: “একটু এদিকে আসুন। একটা অষুধ দেব।”

এরপর ইশা একটা ট্যাবলেটের পাতা ড্রয়ার থেকে বের করে অর্জুন সেনের হাতে দিয়ে বলল,

ঈশা: “এই অষুধটা আপনি রাতে ঘুমানোর আগে খাবেন।”

অর্জুন: “এটাকি ঘুমের অষুধ?”

ইশা: “না, এটা মাইন্ড রিলাক্সেশন ও এন্টি-ডিপ্রেশন এর ট্যাবলেট। আমার কাছে কিছু ছিল তাই আপনাকে দিলাম। এর জন্য কোনো টাকা লাগবে না।”

ইশা একটু মুচকি হাসলো। অর্জুন ক্লিনিক ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

ইশার কথাগুলো অর্জুনের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সেদিন রাতে অর্জুন অভ্যেস মত ছাদে মদ খেতে বসে। কিছুক্ষণ মদ খাওয়ায় পর সে নিজেকে নিজেই বলতে থাকে,

অর্জুন: “আমি কি পারব? এত ভুল করেছি যে মনে হয় সব শেষ।”

ঈশার একটা কথা তার কানে বাজছিল,

ঈশা: “শুরুটা এখানেই। আপনার এই মনের পরিবর্তনই প্রথম পদক্ষেপ। সময় নিন, কিন্তু নিজেকে শুধরে নিন।” 

সেদিন রাতে সে ইশার দেওয়া ওষুধটা খেল। ওষুধটা খাওয়ায় পর সে নিজেকে খুব ফুরফুরে ও হালকা মনে করছিল।

ওই দিনের পর আরো ২-৩ মাস ধরে থেরাপি সেশন চলতে লাগলো। ঈশার দেওয়া ওষুধটা অর্জুন নিয়মিত নিতে নিতে ওই ওষুধে নিজের অজান্তেই আসক্ত হয়ে পড়েছিল। সামনে ভোটের দিন এগিয়ে আসছিল। অর্জুনের কাজের চাপের সাথে সাথে মানসিক চাপ বাড়ছিল। সে মানসিক চাপ কম করার জন্য ওই ট্যাবলেটটা দিনে ২-৩ বার করে নিতে শুরু করল।

অধ্যায় ৯: বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

অর্জুন তার পরবর্তী সেশনের জন্য ইশার ক্লিনিকে এলো। নিয়মমত ঈশা সাধারণ কয়েকটা প্রশ্ন করার পর বুঝতে পারল, অর্জুন তার দেওয়া ট্যাবলেটের ওভার ডোজ নিতে শুরু করেছে। ঈশা মনে মনে স্বস্তি পেল। এবং ভাবলো,

ঈশা: “এবার সঠিক সময়, মাছ ধরার।”

ঈশা তার মূল কাউন্সিলিং শুরু করল, কিছুক্ষণ পর ইশার সোজাসাপ্টা প্রশ্ন অর্জুনের গায়ে যেন কাঁটা ধরিয়ে দিল। ঈশা জিজ্ঞেস করল,

ঈশা: “তাহলে কি আপনি মনে করেন, আপনার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন?” 

অর্জুন: (একটু বিরক্তি মিশ্রিত সুরে) “ক্ষমতার অপব্যবহার? না, আমি শুধু পরিস্থিতি সামলেছি। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে যা করা দরকার, সেটাই করেছি।”  

ইশা: “কিন্তু আপনার কাজের কারণে কতগুলো পরিবার ভেঙে গেছে, কখনো ভেবে দেখেছেন?”  

এই প্রশ্নে অর্জুন থমকে গেল। তার শরীরের ভাষা বদলে গেল, চেহারায় এক ধরনের অস্বস্তি ফুটে উঠল। সে জবাব দিল,

অর্জুন: “আমি কি করে জানব? আমার কাজ হলো দেশ চালানো। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন আমার দেখার দায়িত্ব নয়।”  

ইশা: (এক মুহূর্ত চুপ করে রইল) “তাহলে কি আপনি মনে করেন, আপনার কোনো কাজ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেনি? আপনি কি জানেন, আপনার ঘুষ নেওয়া, অপরাধীদের রক্ষা করার জন্য কত জীবন নষ্ট হয়েছে? কত মানুষ তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে বা তাদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে গেছে?”

অর্জুন কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার ঠোঁট শুকিয়ে গেল। চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে এল, যেন তার মনের মধ্যে অপরাধবোধের এক গভীর ঢেউ উঠে গেল। চশমাটা খুলে টেবিলে রাখল, যেন চোখের সামনে থেকে দৃষ্টিভঙ্গির এক ভার সরাতে চাইছে।  

অর্জুন: (ধীরে ধীরে বলল) “আপনার কথাগুলো হয়তো ঠিক, কিন্তু আমি যা করেছি, সেটাও কি সব ভুল? আমি তো শুধু আমার জায়গা রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। সবাই তো এটাই করে!”  

ইশা: “তাহলে কি আপনি চান, আপনার ভুল অন্যদের ভুলের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাক? আমাদের সবার জীবনে এমন সময় আসে, যখন আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে কষ্ট হয়। কিন্তু সেটাই তো সেই মুহূর্ত, যখন আমরা নিজেকে বদলানোর সুযোগ পাই।”

অর্জুন: (কিছুক্ষণ চুপ করে রইল) “আপনার কথা আমার মনে ধরেছে। কিন্তু সহজ হবে না। আমি এমন জগতে আছি, যেখানে দুর্নীতি ছাড়া টিকে থাকা যায় না।”  

ইশা: “কিন্তু আপনি কি ভেবে দেখেছেন, পরিবর্তন কোথা থেকে শুরু হয়? আমাদের ভিতর থেকে। আপনি যদি সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে চান, তাহলে প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে আপনাকেই। সাহস আর সততার সঙ্গে।” 

অর্জুন: (দীর্ঘশ্বাস ফেলল) “আমি চেষ্টা করব। তবে সময় লাগবে।”

ইশা: (হাসি) “সময়ের সঙ্গেই সত্যিকারের পরিবর্তন আসে। আপনি পারবেন। নিজেকে সুযোগ দিন।”

তারপর ঈশা তার ড্রয়ার থেকে আরেকটা ট্যাবলেটের পাতা থেকে ৩ টা ট্যাবলেট বের করে বলল, 

ইশা: “এখন একটা, সন্ধ্যা বেলা একটা আর একটা রাতে। তবে আপনি এটা মাথায় রাখবেন যে শেষ ট্যাবলেট টা খাওয়ার পর যেন মিনিমাম ৩০ মিনিট পরে ড্রিংক করেন। ভালো থাকবেন।” 

সেদিন সেশন শেষ হল। অর্জুন ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল, আর ইশা নিজের টেবিলে বসে তার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে লাগল। সায়ন একটু পরে ক্লিনিকে এল, ঈশা তার দিকে তাকিয়ে হেঁসে বলল,

ঈশা: “আজ ব্রহ্মাস্ত্র দেওয়া হয়েছে, এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।”

পরের দিন সকালে শেখর ফোন করে ঈশাকে বলল যে আগের দিন রাতে অর্জুন সেন প্রচুর ড্রিংক করার জন্য হার্ট এটার্ক এ মারা গেছেন। পুলিশ ময়না তদন্তের জন্য নিয়ে গেছে। সন্ধ্যের দিকে শেখর আবার ইশাকে ফোন করে জানায়। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ যেটা মনে করেছিল সেটাই ঠিক, প্রচুর ড্রিংক করার জন্য হার্ট এটার্ক-এ অর্জুন সেন মারা গেছেন। ঈশা তাকে সান্তনা দিয়ে ফোনটা রেখে দিল। তারপর সায়নকে ফোন করে ওদের সাকসেস’এর কথা জানালো।

জীবাণু দিয়ে হত্যা - সত্য ঘটনা: সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত এক রহস্যময় বাংলা ছোট গল্প—বিষাক্ত সূচে যুবরাজের মৃত্যু, ভাইয়ের ষড়যন্ত্র, আর এক বিজ্ঞানভিত্তিক খুনের ইতিহাস যা আপনাকে শিহরিত করে তুলবে। সম্পূর্ণ বাংলা ছোট গল্পটি পড়তে ও অডিও স্টোরির স্বাদ উপভোগ করতে এই লিংকটি ক্লিক করুন।

অধ্যায় ১০: ঠেলায় পড়লে বাঘেও ধান খায়

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

সন্ধ্যা ৭ টা হবে। শহরের আলো ঝলমলে থাকলেও সায়নের ফ্ল্যাটে একটা গাঢ় নিস্তব্ধতা। ঘরের মাঝখানে রাখা একটি কাঠের টি-টেবিলে ছড়ানো আছে নোটবুক, পেন, আর সিগারেটের অর্ধেক খালি প্যাকেট। সায়ন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল, আর ঈশা তার উল্টো দিকের সোফায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। সায়ন ইশার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

সায়ন: “তুমি কি নিচ্ছিত ছিলে হার্ট এটার্ক এর ব্যাপারটা নিয়ে। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা।”

ঈশা চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে নিজে একটা সিগারেট ধরিয়ে সায়ানের পাশে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করল,

ঈশা: “অর্জুন সেন যখন প্রথম বার আমার কাছে আসে তখন আমি প্রথম সেশনে বুঝতে পেরে ছিলাম উনাকে ইমোশনালয় করে দমানো যাবে না। রাজনৈতিক নেতা, ওরা অন্যের ইমোশন নিয়ে খেলা করে। তারপর আমি নেক্সট ইলেকশন এর একটা সম্ভাব্য তারিখ খুঁজে বের করলাম। দেখলাম আমাদের হাতে ৩-৪ মাস সময় আছে। আমি আমার একজন বন্ধু রজতকে ইমেইল করলাম। রজত আমেরিকাতে আন্টি ডিপ্রেশন ড্রাগ নিয়ে রিসার্চ করছে। তার কাছ থেকেই এই দুটো ওষুধের সন্ধান পাই। সব রাজনৈতিক নেতারা ভোটার আগে সবচেয়ে বেশি ডিপ্রেশন এ থাকে। তাই আমি খুব আত্মবিশ্বাসী ছিলাম ওই প্রথম ট্যাবলেট’টা অর্জুন সেন ওভারডোজ নেবে। কিন্তু ওই ট্যাবলেটের একটা সাইড ইফেক্ট ছিল, যদি কেউ ওটা ২৪ ঘন্টায় একটির বেশি নেয় তাহলে হার্ট দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। এই সাইড এফেক্টের কথা আমি অর্জুন সেনের কাছে লুকিয়ে গিয়েছিলাম।”

“তবে আমাদের কাছে যেটা পজেটিভ দিক ছিল, সেটা হল অর্জুন সেন-এর মদের প্রতি আসক্তি। ওই ড্রাগটা এলকোহলের সাথে মিশলে হার্ট’এ ব্লকেজ বাড়ায়। তাই ২-৩ মাস ধরে অর্জুন সেনের হার্ট ধীরে ধীরে দুর্বল আর তাতে ব্লকেজ তৈরী হতে থাকে। শেষে যেদিন এসেছিল সেদিন আমি ব্লাড প্রেসার হাই করার একটা ওষুধ দেই। আর সেদিন অর্জুন সেন ৩ বার অষুধটা খেয়েছিল, ব্লাড প্রেসার হাই হচ্ছিল আর যখন সে মদ খায় তখন ওর হার্ট-বিট হাই হতে থাকে এবং ব্লকেজ থাকায় কার্ডিয়াক এরেস্ট হয়।”

ইশার কথাগুলো সায়ন খুব মন দিয়ে শুনছিল। কথাটা শেষ হতেই সায়ন উত্তেজনায়

সায়ন: “ব্রিলিয়ান্ট”

বলে ইশাকে জড়িয়ে ধরল। আবেগে ইশাকে কিস করতে যাবে এমন সময় সে নিজেকে সামলে নিয়ে ইশাকে,

সায়ন: “সরি”

বলে একটু দূরে দাঁড়াল। প্রথম চারটি ‘অভিযান’-এর পর সায়ন আর ঈশার সম্পর্ক এক অদ্ভুত গভীরতায় পৌঁছেছে। তাদের একে অপরের প্রতি টান ছিল শুধু শারীরিক নয়, বরং একধরনের মানসিক আশ্রয়। কিন্তু তারা কোনোদিন একে অপরকে সেই কথা জানতে দেয়নি। সায়নের নিখুঁত লেখনী আর ঈশার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল একে অপরকে সম্পূর্ণ করত। ঈশা সায়নের অবস্থার কথা বুজতে পারছিল। সে শুধু বললো,

ঈশা: “ঠিক আছে”

বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। রাত ৯ টার দিকে ওরা ডিনার করতে বসল। ডিনার টেবিলে সায়ন হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, 

সায়ন: “আমরা কী করছি, জানো?”

ঈশা: (শান্ত গলায়) “শিল্প সৃষ্টি করছি,” 

সায়ন: (মৃদু হাসল) “হ্যাঁ, ঠিক তাই। আর্টিস্টদের সবাই সবসময়ই ভুল বোঝে। আমাদের..ও কেউ ভুল বুঝবে।”

ঈশা: “তাদের বোঝার দরকার নেই। আমরা নিজেদের কাজ জানি। তোমার লেখা পড়ে কখনো কখনো মনে হয়, তুমি শুধু ঘটনা লিখছ না, তুমি আমাদের এই ‘শিল্প’কে অমর করে দিচ্ছ।”

সায়ন: (একটু হেসে) “তোমার পরিকল্পনা না থাকলে এই লেখা মূল্যহীন। আমরা একে অপরের জন্য তৈরি।”

অধ্যায় ১১: যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

ডিনার টেবিলে সেদিন অদ্ভুত এক নীরবতা বিরাজ করছিল। নতুন কোনো কেস নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল না, আর নিজেদের মধ্যে তেমন কথাও বলছিল না তারা। তবুও, বাতাসে যেন এক অদৃশ্য টানাপোড়েনের সুর বেজে চলেছিল। ইশা নীল রঙের সিল্কের নাইট গ্রাউনে আজ যেন এক অন্যরকম আভায় দীপ্ত হচ্ছিল। তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, প্রতিটি দৃষ্টি সায়নের মনকে বারবার আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল।  

খাবার খেতে খেতে মাঝে মাঝে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল। ইশার চোখের গভীরে যেন কোনো না বলা গল্পের ছায়া লুকিয়ে ছিল। সায়ন সেই চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের কথা বলতে চাইলেও যেন কিছুতেই ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না। 

ইশা: (হালকা হাসি) “তুমি হটাৎ চুপচাপ হয়ে গেলে কেন?”  

সায়ন: (কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল; তারপর বলল) “তোমাকে’ই দেখছি। মনে হচ্ছে, অনেক কিছু বলার আছে, কিন্তু কথাগুলো ঠিক মুখ থেকে বেরোচ্ছে না।”  

ইশা: (ঠোঁটে হালকা এক চিলতে হাসি) “কথার দরকার নেই সবসময়। কখনো কখনো চোখের ভাষাই যথেষ্ট।”  

সায়ন একমনে তাকিয়ে থাকল ইশার দিকে। নীরব রাতের এই ছোট্ট মুহূর্ত তাদের দুজনের মনকে এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে দিল। ডিনার শেষ করে ওরা দুজনে দুটো ওয়ানের গ্লাস নিল। দুজনে ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিল।

সায়ন: “ঈশা, তুমি কি কখনো ভয় পাও?”

ঈশা: “ভয়? ভয় কিসের? ধরা পড়ার? না নিজেদের ভুল প্রমাণিত হওয়ার?”

সায়ন: “দুটোই,” 

ঈশা: “না, আমি ভয় পাই না। আমরা যা করছি, তা তো ন্যায়বিচারেরই আরেক রূপ। অন্যরা যা পারে না, আমরা তাই করছি।”

তারপর ঈশা গভীর দৃষ্টিতে সায়নের দিকে তাকাল। সায়নের চোখে যেন এক অদ্ভুত নেশা লুকিয়ে ছিল, যা ঈশাকে মুগ্ধ করে তুলছিল। তার চেহারার মধ্যে এক ধরনের আকর্ষণ, যা তাকে আরও কাছে টেনে নিচ্ছিল। সায়ন হালকা হাসি দিয়ে বলল,

সায়ন: “কি হলো? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”

ঈশা: (একটু লজ্জা পেয়ে) “তোমার চোখে একটা অদ্ভুত টান আছে। মনে হয় যেন কিছু বলতে চাইছো, কিন্তু বলছো না।”

সায়ন: (হেসে বলল) “তুমি আমার মনের কথা এত সহজে বুঝে গেলে?”

ঈশা আর কিছু বলল না, কিন্তু তার মনের ভেতরে সায়নের প্রতি একটা অদ্ভুত টান কাজ করছিল। 

সায়ন ওয়াইনের বোতল থেকে দুজনের গ্লাসে আরো একটু করে ওয়াইন ঢেলে দিল। সন্ধ্যা থেকে চলা কথোপকথন ধীরে ধীরে গভীর রাত্রির নীরবতায় মিশে যাচ্ছিল। ব্যালকনির বাইরে রাতের আকাশ যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছিল। বাতাসে হালকা শীতলতা, কিন্তু তাদের মধ্যে উত্তাপ ছিল অন্যরকম।

ঈশা গ্লাসটা তুলে নিয়ে সায়নের দিকে তাকাল। তার চোখে ছিল এক গভীর টান, যা অস্বীকার করা সম্ভব ছিল না সায়ানের মুখে। সায়ন তার চোখের দিকে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর একটু হেসে বলল,

সায়ন: “আজকের রাতটা মনে রাখার মতো, তাই না?”  

ঈশা: (হালকা হাসি) “কিছু রাত জীবনে থেকে যায়… এই রাতটা হয়তো তাদের মধ্যে একটা।”  

সায়নের ফ্ল্যাটের ব্যালকনি অন্ধকারে ডুবে ছিল। বাইরে শহরের আলোগুলো ঝাপসা হয়ে ছিল, কিন্তু তাদের মধ্যে যেন আলো জ্বলছিল। সায়ন গ্লাস নামিয়ে ঈশার দিকে এগিয়ে এল। তার চোখের ভাষা, তার শরীরের ভঙ্গি—সবকিছুই বলে দিচ্ছিল, যে এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল।  

ঈশা ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে সায়নের কাঁধে রাখল। তার হাতের উষ্ণতা সায়নকে আরও কাছে টেনে আনল। সায়নের মুখটা নিজের মুখের কাছে টেনে এনে ঈশা তার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁলো। সেই মুহূর্তে সময় যেন থেমে গিয়েছিল।  

সায়নও হয়তো এই দিনটার জন্য দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিল। তার ভেতরের অনুভূতিগুলি এখন আর বাঁধ মানছিল না। সে ঈশার কোমরের চারপাশে হাত রেখে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। দুজনের মধ্যে থাকা সব দূরত্ব যেন মুহূর্তেই মুছে গিয়েছিল।  

রাত গভীর হয়ে আসছিল, কিন্তু তাদের এই নতুন সম্পর্কের শুরু যেন এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দিল। তারা জানত না এই মুহূর্তটি তাদের জীবনে কী পরিবর্তন আনবে, তবে তারা জানত, এই রাতটা শুধুই তাদের।

ব্যালকনির নীরব অন্ধকারে তারা একে অপরের ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে অনেক্ষন থমকে ছিল, যেন সময় থমকে গেছে। রাতের হালকা শীতল বাতাসে তাদের উষ্ণতা মিশে যাচ্ছিল। ঈশার হাত ধীরে ধীরে সায়নের গলা স্পর্শ করছিল, আর সায়নের হাত ঈশার কোমর ধরে আরও শক্ত করে টেনে নিচ্ছিল। সেই মুহূর্তে তারা দুজনেই বুঝতে পারছিল, এ সংযোগ শুধু শারীরিক নয়—এর গভীরে ছিল এক অদ্ভুত মানসিক বাঁধন।  

কিছুক্ষণ পরে  তারা ধীরে ধীরে সায়নের বেডরুমে এসে পৌঁছায়। ঘরের মৃদু আলো আর স্নিগ্ধ পরিবেশ তাদের অনুভূতিকে আরও গাঢ় করে তুলছিল। সায়ন ঈশার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, তার চোখে একরকম প্রশংসা আর গভীর আকর্ষণ ফুটে উঠেছিল। ঈশা হাসতে হাসতে ধীরে ধীরে সায়নের শার্ট খুলে ফেলল। সায়নও ঈশার কাঁধে হাত রেখে তার গাউন খুলতে শুরু করল।  

তাদের দৃষ্টিতে ছিল অদ্ভুত টান। একে অপরকে স্পর্শ করার প্রতিটি মুহূর্ত যেন নতুন এক অনুভূতি নিয়ে আসছিল। ঈশা সায়নের চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে বলল,

ঈশা: (চরম আবেগের সুরে) “তুমি ছাড়া আমি এটা করতে পারতাম না। তুমি আমাকে পূর্ণ করছ।” 

সায়ন ঈশার চুলে হাত বুলিয়ে বলল,

সায়ন: তুমিই তো আমাকে জীবন দিয়েছ। তোমার ছাড়া আমি আজ শূন্য হয়ে যেতাম।

তার কথাগুলি ঈশার হৃদয়কে আরও গভীরভাবে ছুঁয়ে গেল।  

তারা একে অপকে জড়িয়ে ছিল। সেই রাতে তাদের শরীরের ভাষা, তাদের ভালোবাসা আর আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছিল। ভালোবাসা, পাগলামি, আর ন্যায়বিচারের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা তাদের সম্পর্ক যেন নতুন অর্থ পেতে শুরু করল।  

ঈশার মাথা সায়নের বুকে রাখা ছিল, আর সায়নের হাত ঈশার পিঠে এলো চুলগুলোকে নিয়ে খেলা করে বেড়াচ্ছিল। তারা জানত, এই সংযোগ শুধুমাত্র শারীরিক নয়—এটি তাদের জীবনের সমস্ত অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দিচ্ছিল। তাদের ভালোবাসা যেন সমস্ত বাধা অতিক্রম করে একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম দিচ্ছিল।  

সেই রাতে তারা একে অপরের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল, এক অদ্ভুত আবেগ আর অনুভূতিতে ভেসে গিয়েছিল তারা দুজনেই। তাদের সম্পর্কের এই নতুন অধ্যায় তাদের জীবনে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন নিয়ে আসবে, যা তারা তখনই বুঝতে পারছিল না। তবে তারা জানত, এই রাতের মুহূর্তগুলি তাদের জন্য চিরকালীন হয়ে থেকে যাবে।

অধ্যায় ১২: অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

শহরের রাজনীতি অচল হয়ে গিয়েছিল এক মুহূর্তে। অর্জুন সেনের অকাল মৃত্যুর খবর চারদিকে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। কমিশনার সত্যজিৎ দেবনাথ খবর পাওয়া মাত্রই বালিগঞ্জ থানার ওসি’কে ফোন করলেন। ওসি জানালেন, অর্জুন সেনের মৃত্যুর কারণ হার্ট অ্যাটাক। তবে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এলে আরও পরিষ্কার হবে সবকিছু। কিন্তু সত্যজিৎ দেবনাথ নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। সমরেশ একবার জানিয়েছিল, অর্জুন সেন নিয়মিত ঈশা রায়ের ক্লিনিকে যেতেন। তাহলে কি আত্মহত্যা?

কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তিনি সমরেশকে ফোন করলেন।

সমরেশ: হাল্লো স্যার!

সত্যজিৎ: “আপনি আর অপরাজিতা এখনই এক্ষুনি অফিসে আসুন। দেরি করবেন না।”

সমরেশ: ওকে স্যার!

সমরেশ অপরাজিতাকে সঙ্গে নিয়ে কমিশনার অফিসে পৌঁছাতেই দেখলেন আদিত্য নস্কর ওদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

আদিত্য: আসুন! স্যার আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

তিনজন একসাথে সত্যজিৎ দেবনাথের কেবিনে প্রবেশ করল। কমিশনারের সামনে সেলুট জানিয়ে চেয়ার টেনে বসল তারা।

সত্যজিৎ: আপনারা সবাই জানেন, অর্জুন সেনের অকাল মৃত্যুর ঘটনা।

তিনজন একসাথে: ইয়েস স্যার!

সত্যজিৎ: সমরেশ বাবু, আপনার কাছে কি আপডেট আছে?

সমরেশ: স্যার! আমি এবং আমার টিম অয়ন মুখার্জীর মৃত্যুর পর থেকে ঈশা রায় ও সায়নের উপর নজর রাখছিলাম। ছয় মাস আগে ঈশা ও সায়নকে অর্জুন সেনের অফিসের সামনে দেখা যায়। এরপর নজরদারি বাড়াই। এক মাস পরে অর্জুন সেন ঈশা রায়ের ক্লিনিকে নিয়মিত যেতে শুরু করেন।

কিন্তু সন্দেহের বিষয় হলো, অর্জুন সেন যখন ক্লিনিক থেকে বেরোতেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই সায়ন সেখানে আসতেন। এটা সবসময় না, তবে বেশিরভাগ সময়ই ঘটেছে।

সত্যজিৎ: ব্রিলিয়ান্ট! মিস চ্যাটার্জী, আপনার ক্রিমিনোলজি রিসার্চ কী বলছে?

অপরাজিতা: আমি মূলত সায়নের উপর ফোকাস করেছি। ওর লেখা উপন্যাস “অরূপের প্রতিচ্ছবি” আমি পড়েছি। উপন্যাসটি মার্ডার মিস্ট্রি, সাসপেন্স থ্রিলার… উপন্যাসটি বেস্ট সেলার এ গিয়েছিল…..

সত্যজিৎ: মিস চ্যাটার্জী! সরি টু সে, আপনি কি যা-তা বলছেন, এটা কি সাহিত্য সভা চলছে? সায়নের কোনো মার্ডার মোটিভ ছিল কি না, সেটা বলুন।

অপরাজিতা: সরি স্যার! আমার মতে, একজন লেখক যখন সাসপেন্স থ্রিলার বা মার্ডার মিস্ট্রি লেখেন, তখন তার মানসিকতা একজন অপরাধীর মতো হয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পোল্যান্ডের লেখক ক্রিস্টিয়ান বালা ২০০৭ সালে দারিউস জেনেসজেউস্কির হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত হন। হত্যার তিন বছর পর প্রকাশিত তার উপন্যাস ‘আমোক’-এ অপরাধের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়, যা থেকে বোঝা যায় যে তিনি অপরাধ সম্পর্কে অভ্যন্তরীণ জ্ঞান রাখতেন।

এমন আরও লেখক আছেন, যেমন—অ্যান পেরি, পলা লেবেল, উইলিয়াম এস. বুরোস।

সত্যজিৎ: ইন্টারেস্টিং! বলতে থাকুন!

অপরাজিতা: আমার মনে হয়, ঈশা রায় আর সায়ন ঘোষ এই রকম কিছু পরিকল্পনা করছেন।

সমরেশ: আমি ঈশার ব্যাপারে আরও খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ঈশা একটি মনস্তাত্ত্বিক আলোচনা সভার মুখ্য বক্তা ছিলেন। আলোচনা সভার শিরোনাম ছিল—”মনের গভীর-অন্ধকারে প্রবেশ”। আমি পুরো সভার ভিডিও দেখেছি। সেই সভার ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, সায়ন ঘোষ ওই সভায় দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

সত্যজিৎ: ব্রিলিয়ান্ট! মিস্টার বিশ্বাস! বলতে থাকুন, আর কী খবর আছে।

সমরেশ: সেই সভা যে অডিটোরিয়ামে হয়েছিল, তার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ঈশা রায়ের বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর সায়ন ব্যক্তিগতভাবে ঈশার সঙ্গে দেখা করতে গ্রিন রুমে যান এবং প্রায়…. ১৫-২০ মিনিট পরে বেরিয়ে আসেন।

আদিত্য: সায়ন কি ঈশাকে সেই সভার আগে থেকেই চিনতেন?

অপরাজিতা: না।

সত্যজিৎ: আপনি এত নিশ্চিত হয়ে ‘না’ বলছেন কীভাবে?

অপরাজিতা: কারণ স্যার, সেই সভার আগের ছয় মাসের সিসিটিভি ফুটেজে সায়নকে ঈশার ক্লিনিকের আশেপাশে দেখা যায়নি। কিন্তু সেই সভার পর থেকে সায়ন নিয়মিত ঈশার ক্লিনিকে যাতায়াত শুরু করেন।

সত্যজিৎ: আপনি কোন সিসিটিভি ফুটেজের কথা বলছেন, মিস চ্যাটার্জী?

অপরাজিতা: ঈশা রায়ের ক্লিনিকের বিপরীতে একটি শপিং মলের গেটের সিসিটিভি।

সত্যজিৎ: সমরেশ এবং মিস: চ্যাটার্জী আপনারা সব এভিডেন্স গুলো ডকুমেন্ট করে আদিত্য বাবুর কাছে জমা করুন। আদিত্য বাবু আপনি বালিগঞ্জ থানার ওসির সাথে অর্জুন সেনের কেসটা ফলো-আপ করুন, পারলে আপনি একবার বালিগঞ্জ থানায় চলে যান, ওসি কে বলবেন আমি পাঠিয়েছি; ওসির সাথে আমার কথা হয়ে গেছে। 

তিনজন একসাথে: ওকে স্যার!

সত্যজিৎ: আজকে আপনারা আসুন। সমরেশ বাবু কোনো নতুন আপডেট পেলে আমাকে ডিরেক্ট আপডেট দেবেন।

সমরেশ: সিওর স্যার! (একটু থেমে) স্যার আমরা কি একবার ঈশা ও সায়ন কে থানায় ডেকে পাঠাবো। 

সত্যজিৎ: না! এখন সময় আসে নি, মাছকে আর একটু জলে খেলতে দাও। 

তিনজন চেয়ার ছেড়ে স্যালুট করে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। 

আদিত্য সত্যজিৎ দেবনাথের নির্দেশ মেনে সেদিন সন্ধ্যায় বালিগঞ্জ থানায় হাজির হন। থানার ভিতর ঢুকেই তিনি ওসির রুমে যান। ওসি তখন টেবিলে মাথা নামিয়ে কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন। 

ওসি: হ্যালো! আসুন মিস্টার নস্কর, বসুন! আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। 

আদিত্য: ধন্যবাদ। পোস্টমর্টেম  নিয়ে কিছু জানা গেল? 

ওসি: হ্যাঁ, পোস্টমর্টেম শেষ হয়েছে। ডাক্তারদের বয়ান অনুযায়ী, অর্জুন সেন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। রিপোর্ট আসতে ২-৩ দিন লাগবে। তবে… 

আদিত্য: (কৌতূহলী হয়ে) তবে? 

ওসি সামনে থাকা ফাইলের এক পাতা উল্টে ফেললেন, তারপর গলা নিচু করে বললেন— 

ওসি: ডাক্তারদের টিমের একজন একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার বলেছেন। অর্জুন সেনের শরীরে এমন কিছু ড্রাগ পাওয়া গেছে, যেটা তার নেওয়া উচিত ছিল না। 

আদিত্য: (ভ্রু কুঁচকে) কী ধরনের ড্রাগ? 

ওসি: সেটা এখনই বলা মুশকিল। ওই ডাক্তার আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন, যেন আমরা অর্জুন সেনের ফ্যামিলি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। 

এই বলে ওসি তার হাতে থাকা একটি সাদা কাগজ তুলে ধরেন। 

ওসি: (কাগজটি আদিত্যর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে) ডাক্তারবাবু আমাদের জন্য এটা লিখে দিয়েছেন। বলেছেন, এই লেখাটা অর্জুন সেনের পারিবারিক চিকিৎসককে দেখাতে। 

আদিত্য কাগজটা হাতে নিয়ে দ্রুত একবার পড়ে ফেলেন, কিন্তু সেটায় ডাক্তারি ভাষায় কিছু লেখা ছিল, যা তার পক্ষে বোঝা একেবারেই কঠিন। 

আদিত্য: ফরেনসিক রিপোর্ট কবে আসবে? 

ওসি: আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে। তখন ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। 

আদিত্য চিন্তিত মুখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন— 

আদিত্য: তাহলে কালই আমি অর্জুন সেনের ফ্যামিলি ডাক্তারকে খুঁজে বের করব। দেখি উনি কিছু বলতে পারেন কিনা। 

ওসি: ভালো কথা! আর হ্যাঁ, ফরেনসিক রিপোর্ট এলেই আপনাকে ফোন করবো। 

আদিত্য মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে থানার দরজা পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তিনি প্রথমে সত্যজিৎ দেবনাথকে পুরো বিষয়টি জানালেন। পরে সত্যজিৎ দেবনাথ সমরেশ ও অপরাজিতাকে কনফারেন্সে নিয়ে এ বিষয়ে আলোচনা করেন।

চার দিন পর, আদিত্য ও সমরেশ পুনরায় বালিগঞ্জ থানায় উপস্থিত হন। সেখানে ওসিকে জানান যে অর্জুন সেনের পারিবারিক চিকিৎসক তাকে পোস্টমর্টেম রিপোর্টে উল্লিখিত কোনো ধরনের ড্রাগ কখনো প্রেসক্রাইব করেননি। সমরেশ ও আদিত্য ওসির কাছ থেকে শেখরের বিষয়েও জানতে পারেন।

পরের দিন, শেখরকে থানায় ডেকে সমরেশ, আদিত্য ও অপরাজিতা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। প্রথমে শেখর কিছুটা ভয় পেলেও পরে সে সম্পূর্ণ ঘটনার বিশদ বিবরণ দেয়। সে ব্যাখ্যা করে, কীভাবে ঈশার সঙ্গে তার পরিচয় ফেসবুকে হয় এবং কীভাবে সে অর্জুন সেনকে ঈশার কাছে থেরাপি নেওয়ার জন্য রাজি করায়।

শেখরের বয়ান রেকর্ড করার পর তা ডকুমেন্ট করে কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়।

অধ্যায় ১৩: রাত পোহালেই কি পান্তা ভাত হয়

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

এক মাস কেটে গেছে। সত্যজিৎ দেবনাথ এবং তার গোয়েন্দা দল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল অর্জুন সেনের ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য। অবশেষে সেই রিপোর্ট এসে পৌঁছল। কমিশনার সত্যজিৎ দেবনাথ, সমরেশ, অপরাজিতা ও আদিত্য ছাড়াও এই বিশেষ তদন্ত টিমে আরও কয়েকজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। নতুন টিম মেম্বারদের মধ্যে ছিলেন স্মিতা সেনগুপ্ত, একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ; রাহুল বোস, একজন বিখ্যাত সাসপেন্স থ্রিলার লেখক; রঞ্জনা সেন, একজন মনোবিজ্ঞানী; ড. সিদ্ধার্থ মজুমদার, একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ; এবং অর্জুন সেনের পারিবারিক চিকিৎসক, ড. প্রীতম দাস। এছাড়াও, বালিগঞ্জ থানার ওসি বিক্রম রায়ও এই আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন।  

সেদিন নির্ধারিত সময়ে সবাই কমিশনার সত্যজিৎ দেবনাথের অফিসে উপস্থিত হলেন। প্রতিটি মুখে উদ্বেগের ছাপ। সত্যজিৎ দেবনাথ সবার দিকে তাকিয়ে বললেন,  

সত্যজিৎ: “আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আজ আমরা অর্জুন সেনের মৃত্যুর পিছনে লুকিয়ে থাকা সত্যটি উদ্ঘাটন করার জন্য এখানে একত্রিত হয়েছি। ড. প্রীতম দাস, আপনি কি রিপোর্ট সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে পারেন?”  

ড. প্রীতম দাস নথিপত্রের ফাইল খুলে বললেন,  

ড. প্রীতম দাস: “পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী, অর্জুন সেন মৃত্যুর দিন প্রচুর মদ্যপান করেছিলেন, যার ফলে তার হার্ট অ্যাটাক হয়। তবে এই রিপোর্টে যে তথ্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো—তার রক্তে দুটি বিশেষ ড্রাগ পাওয়া গেছে, যেগুলোর কোনোটাই তার জন্য প্রেসক্রাইব করা হয়নি।”  

এক মুহূর্তের নীরবতার পর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ স্মিতা সেনগুপ্ত বললেন,  

স্মিতা সেনগুপ্ত: “আমরা ফরেনসিক পরীক্ষায় যা পেয়েছি, তা সত্যিই অস্বাভাবিক। অর্জুন সেনের শরীরে ‘মুডক্সিল’ এবং ‘প্রেসরিন’ নামের দুটি ড্রাগ পাওয়া গেছে। মুডক্সিল একটি অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, যা হতাশা কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, প্রেসরিন একটি উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধিকারী ওষুধ। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ড. সিদ্ধার্থ মজুমদার এবং থানার ওসি বিক্রম রায়, দুজনেই নিশ্চিত করেছেন যে এই দুটি ড্রাগ অর্জুন সেনকে কখনও প্রেসক্রাইব করা হয়নি।”  

ড. সিদ্ধার্থ মজুমদার: (গম্ভীর কণ্ঠে), “এখানেই রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। মুডক্সিল এবং প্রেসরিন একে অপরের সম্পূর্ণ বিপরীত ওষুধ। সাধারণত, এই দুটি ড্রাগ একসঙ্গে ব্যবহার করা হয় না, বিশেষ করে কারো হৃদরোগ থাকলে। মুডক্সিলের একটি গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে—যদি কোনো ব্যক্তি অতিরিক্ত মদ্যপান করে, তবে এই ওষুধ তার হার্ট ব্লকেজের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। আর প্রেসরিন উচ্চ রক্তচাপ বাড়িয়ে তোলে। অর্থাৎ, যদি কেউ এই দুটি ওষুধ জেনে-শুনে একসঙ্গে কারো শরীরে প্রবেশ করায়, তবে সেটি সরাসরি তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আমার ধারণা, ঈশা রায় ইচ্ছাকৃতভাবেই অর্জুন সেনকে এই ওষুধ দিয়েছেন।”  

রঞ্জনা সেন, যিনি একজন অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী, একদৃষ্টিতে টেবিলের ওপর রাখা রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে বললেন,  

রঞ্জনা সেন: “২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ঈশা রায় যে কনফারেন্সে অংশ নিয়েছিলেন, সেখানে তিনি বলেছিলেন তিনি ‘হিউম্যান ডার্ক সাইকোলজি’-র উপর গবেষণা করছিলেন। তার কিছু লেখা আমি পড়েছি, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, মনের গভীরতায় প্রবেশ করে কিভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যদি তিনি সত্যিই এই বিষয়ে গবেষণা করছিলেন, তবে খুব সহজেই তিনি অর্জুন সেনের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারতেন।”  

এবার মুখ খুললেন রহস্য কাহিনি লেখক রাহুল বোস,  

রাহুল বোস: “তাহলে কি ঈশা রায় এবং সায়ন ঘোষ একসঙ্গে এই হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন?”  

সত্যজিৎ: “এই তথ্যই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি ঈশা রায় একজন থেরাপিস্ট, যিনি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা দেন। আর সায়ন ঘোষ একজন বিখ্যাত থ্রিলার লেখক। কিন্তু এই দুটি পেশার মধ্যে কি কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে?”  

সমরেশ:  “আমরা যদি শেখরের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিই, তাহলে পরিষ্কার বোঝা যায় ঈশা এবং সায়ন—দুজনেই অর্জুন সেনকে প্রভাবিত করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। ঈশা প্রথমে তার মানসিক অবস্থার সুযোগ নিয়েছিলেন, আর সায়ন তাকে থেরাপির জন্য রাজি করিয়েছিলেন। শেখরের বক্তব্য অনুযায়ী, ঈশার পরামর্শেই অর্জুন সেন তার ওষুধ পরিবর্তন করেছিলেন এবং নতুন ওষুধ নিতে শুরু করেন।”  

অপরাজিতা এবার খেয়াল করলেন, সকলেই একমত হচ্ছেন যে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যা।  

অপরাজিতা: “আমাদের হাতে এখন কি প্রমাণ আছে ওদেরকে এরেস্ট করার জন্য?”  

স্মিতা: “আমাদের কাছে ফরেনসিক রিপোর্ট আছে, যেখানে পরিষ্কারভাবে বলা আছে যে অর্জুন সেনের শরীরে এমন দুটি ড্রাগ পাওয়া গেছে, যা তার মৃত্যুর কারণ হতে পারে।”  

ওসি: “এখন আমাদের ঈশা রায় এবং সায়ন ঘোষকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। আমাদের দেখতে হবে, তারা একে অপরকে কীভাবে চেনে এবং অর্জুন সেনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আসলে কেমন ছিল।”  

সত্যজিৎ: “সুতরাং, আগামীকাল ঈশা রায় এবং সায়ন ঘোষকে থানায় ডাকা হবে এবং তাদের আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আমাদের কাছে এখনো কিছু তথ্য স্পষ্ট নয়, তবে আমরা এই কেসের সমাধানের খুব কাছাকাছি রয়েছি।”  

সমরেশ: কিন্তু স্যার! ওদেরকে থানায় না ডেকে ওদের ফ্ল্যাটে হানা দিলে কেমন হয়।

সত্যজিৎ: সেটা করতে পারেন, আমি সার্চ ওয়ারেন্ট ইসু করে দিচ্ছি, আপনি অপরাজিতা এবং বিক্রম আর ২-৩ জন কনস্টবল কে নিয়ে চলে যান। 

সমরেশ: ওকে স্যার!

সবাই একে একে অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন। রাতে কলকাতার আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। সমরেশ আর আদিত্য একসঙ্গে গাড়িতে ফিরছিলেন।  

আদিত্য: “তোমার কী মনে হয়, ঈশা রায় কি সত্যিই হত্যাকারী?”

সমরেশ চুপ করে রইলো।

অদম্য মায়া - অনুপ্রেরণামূলক বাংলা ছোট গল্প: অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসের অনুপ্রেরণায় ভরা একটি মোটিভেশনাল বাংলা ছোট গল্প—যেখানে হার মানে না জীবনের ঢেউ, বরং জাগে নতুন করে বাঁচার সাহস ও স্বপ্ন। সম্পূর্ণ বাংলা ছোট গল্পটি পড়তে ও অডিও স্টোরির স্বাদ উপভোগ করতে এই লিংকটি ক্লিক করুন।

অধ্যায় ১৪: নৌকা যখন ডোবে, তখন কুমিরও খায়, কাঁকড়াও খায়

বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ ছোট গল্পটির অডিও স্টোরি শুনতে নিচে প্লে বোতাম টি ক্লিক করুন।

পরের দিন সকালে ঈশা টেবিলের উপর ল্যাপটপ খুলে বসেছিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছিল পরবর্তী শিকারের ছবি—একজন কর্পোরেট অফিসার, যে নিকৃষ্ট দুর্নীতিতে ডুবে আছে।

ঈশা: (কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত রকমের দৃঢ়তা) “এই শিকারটা আলাদা হতে হবে,”

সায়ন: “আলাদা? মানে কী? আমরা তো আগেও অনেকবার এমন পরিকল্পনা করেছি।”

ঈশা: “না, সায়ন। এবার আমার নিয়ন্ত্রণ চাই। এই শিকারটা শুধুমাত্র আমার ছকে হবে।”

সায়ন চুপ করে কিছুক্ষণ ঈশার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,

সায়ন: “নিয়ন্ত্রণ? এটা কি শুধু একটা খেলা? কেন তুমি এতটা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে জোর দিচ্ছ?”

ঈশা: (হেসে) “তুমি বুঝবে না, সায়ন। এটা প্রতিশোধ নয়; এটা ক্ষমতার প্রকাশ। আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে শিকার নিজেই আমার সামনে আত্মসমর্পণ করবে।”

সায়নের মনের গভীরে একটি অস্বস্তি তৈরি হল। এতদিন তারা যা করেছিল, তা তার কাছে ছিল একধরনের সৃষ্টিশীল কাজ, যা সমাজের দুর্নীতিপূর্ণ মানুষদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একটা অভিনব পন্থা। কিন্তু ঈশার এই ‘নিয়ন্ত্রণ’ প্রীতির কথা শুনে তার মনে সন্দেহ জন্ম নিল।

সায়ন: “তাহলে তুমি বলতে চাও, এবার কোনো আমাকে ছাড়াই সব কিছু ঘটবে? শুধুমাত্র তোমার মানসিক খেলায়?”

ঈশা: (কণ্ঠস্বর কঠিন) “ঠিক তাই। আর এইবার আমাকে একা করতে দাও।”

সায়ন আর ঈশার মধ্যে এই কথোপকথন ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠতে লাগল। সায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল, তারপর বলল,

সায়ন: “তুমি কি জানো, আমরা যেটা করছি, সেটা কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে? পুলিশ যদি আমাদের পিছু নেয়। আর এবার যদি একটা ভুল করি, সব শেষ হয়ে যাবে।”

ঈশা: (ক্ষুব্ধ হয়ে) “তুমি সব সময় এত ভীতু কেন? এটা আমার খেলা, আমার পরিকল্পনা। আমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। তুমি যদি ভয় পাও, তাহলে এই খেলায় তোমার কোনো প্রয়োজন নেই।”

সায়নের চোখে হতাশার ছায়া পড়ল। সে বলল,

সায়ন: “এটাই যদি তোমার ভাবনা হয়, তাহলে আমার পক্ষে আর এগোনো সম্ভব নয়। এটা আমার শেষ অধ্যায়। আমি এই খেলা বন্ধ করতে চাই।”

ঈশার চোখ রাগে জ্বলজ্বল করতে লাগল। তার কাছে সায়নের এই সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল বিশ্বাসঘাতকতা।

ঈশা: (চিৎকার করে) “তুমি কি আমাকে ছাড়তে চাও, সায়ন? তুমি কি সত্যি এই খেলায় বিশ্বাস কর না?” 

সায়ন: (শান্ত কণ্ঠে) “আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু এই খেলাটা তোমার হাতের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এটা প্রতিশোধের থেকেও বড় কিছু হয়ে উঠেছে। এটা এখন তোমার অহংকারের লড়াই।”

ঈশা বুঝতে পারল পরিস্তিতি অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। সে একটু পরে সায়নকে শান্ত করে নিজেকে সামলে নিল। ঈশা তারপর সায়নের কাছে তার পরবর্তী পরিকল্পনা খুলে ধরল। নতুন শিকার ছিল একজন কর্পোরেট অফিসার, যার দুর্নীতির কারণে শত শত মানুষের চাকরি হারিয়েছে।

এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলো। কলিং বেলের শব্দে ঈশা আর সায়ন দুজনেই চমকে উঠলো। এই সময় কারও আসার কথা ছিল না, কেউ আসার অনুমতি পাওয়ার কথাও না। দুজনেই চোখাচোখি করলো, একটা অস্বস্তি যেন মুহূর্তের মধ্যে ঘিরে ধরলো ওদের দুজনকেই।

ঈশা: (ফিসফিস করে) “কে হতে পারে?”

সায়ন: (চোয়াল শক্ত করে) “দেখে আসছি,”

দরজা খুলতেই ওর চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেলো। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সাব-ইন্সপেক্টর সমরেশ বিশ্বাস ও অপরাজিতা চ্যাটার্জী, সঙ্গে দুজন পুরুষ কনস্টেবল ও একজন মহিলা কনস্টেবল। সায়নের গলা শুকিয়ে এলো।

সায়ন: পুলিশ?!

এক মুহূর্তের জন্য মাথা কাজ করছিল না। পালাতে হবে! এই চিন্তা মনে আসতেই সমরেশকে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যেতে চাইল সে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরের করিডোর থেকে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠলেন ওসি বিক্রম রায়—  

বিক্রম রায়: “এই শুয়োরের বাচ্চা, দাঁড়া!” 

কথার সাথে সাথেই বিক্রম রায় সায়নের জামার কলার ধরে ওকে সজোরে টান মারলেন। সায়ন আর্তনাদ করে ছিটকে পড়ল ফ্ল্যাটের ভেতরে। ঈশা হাঁ করে দেখছিল এই দৃশ্য। সে বুঝতেই পারছিল না কী হচ্ছে!  

সমরেশ একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ঈশার দিকে তাকালেন,

সমরেশ: “নমস্কার, মিস: ঈশা রায়! আপনাকে আর আমাদের থানায় কষ্ট করে আসতে হল না, আমি নিজেই চলে এলাম!”  

তারপর একটু থেমে বললেন,

সমরেশ: “নিজের পরিচয়টা দিই, আমি সমরেশ বিশ্বাস, সাব-ইন্সপেক্টর, গড়িয়াহাট থানা! নাইস টু মিট ইউ!” 

এদিকে অপরাজিতা এগিয়ে গিয়ে ঈশার দুই হাত ধরে শক্ত করে চেপে ধরলেন। এর আগেই বিক্রম রায় সায়নের হাত পেছনে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে দিয়েছেন। অপরাজিতাও একইভাবে ঈশাকে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন।    

ঈশা: (কণ্ঠস্বর কাঁপছিল) “আপনারা এভাবে আমাদের ধরে নিয়ে যেতে পারেন না! আমাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ? এরেস্ট ওয়ারেন্ট আছে?”  

অপরাজিতা: (খেঁকিয়ে উঠল) “এই মাগি, পুলিশকে আইন শেখাবি না!”    

বলেই এক ঝটকায় ঈশার গালে সজোরে একটা থাপ্পড় কষালেন। শব্দটা ঘরের চারপাশে প্রতিধ্বনিত হল। ঈশা একদম থমকে গেল। ব্যথায় চোখে জল এসে গেল তার, ঠোঁটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে নামল রক্ত।  

সায়ন: (উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে) “তোমরা জানো না তোমরা কী করছ!”  

কিন্তু বিক্রম রায় এবার তার চুলের মুঠি ধরে মাথা নিচু করে দিলেন।

বিক্রম রায়: “ভালোয় ভালোয় চুপ করে থাকবি তো থাক, নাহলে খবর আছে!”  

সমরেশ: “মিস রায়, সত্যি বলছি, আজ যদি ইউনিফর্ম না থাকত, তাহলে আপনাকে একটা প্রণাম করতাম! কী মাথা মাইরি, কী ব্রিলিয়ান্স! একদম ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান করা মর্ডার! দুর্দান্ত!”  

ঈশা কিছু বলতে পারছিল না। ওর মাথার ভেতর গোল হয়ে যাচ্ছিল সবকিছু।  

এই ফাঁকে পুলিশের কনস্টেবলরা ফ্ল্যাটের প্রতিটি ঘরে তল্লাশি শুরু করে দিয়েছে। ল্যাপটপ, মোবাইল, ডায়েরি— সবকিছু একের পর এক উদ্ধার হচ্ছে।

একজন কনস্টেবল এগিয়ে এসে বলল,

কনস্টেবল: “স্যার, এই ডায়েরিটা দেখুন! এখানে অনেক কিছু লেখা আছে!”

সমরেশ ডায়েরিটা হাতে নিয়ে দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগলেন। একটু পরেই তাঁর মুখের কোণে বিদ্রূপাত্মক হাসি ফুটে উঠল।  

সমরেশ: “বাহ! বাহ! বাহ! এ তো স্বীকারোক্তির সমান!”  

সমরেশ ঈশার দিকে তাকালেন।

সমরেশ: “কী মিস রায়, আপনি কি জানেন এই ডায়েরিটা আমাদের কতটা সাহায্য করবে? পেজের পর পেজ আপনাদের প্ল্যানিং এর ডিটেলস লেখা আছে! অর্জুন সেনকে মেরে ফেলার প্ল্যান, কীভাবে ড্রাগ দেয়া হবে, সব কিছুর বিস্তারিত লেখা আছে এখানে!”  

ঈশার মুখ সাদা হয়ে গেল। এদিকে অপরাজিতা নিজের মোবাইল বের করে ফোন করলেন,

অপরাজিতা: “স্যার, আমরা ঈশা রায় ও সায়ন ঘোষকে গ্রেপ্তার করেছি! এখনই থানায় নিয়ে যাচ্ছি!”  

সত্যজিৎ: ওকে নিয়ে যাও, আমিও যাচ্ছি।

ঈশার চোখে অন্ধকার নেমে আসছিল। সে জানত, এবার আর পালাবার কোনো পথ নেই!

ঈশা ও সায়নকে গড়িয়াহাট থানায় আনা হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সত্যজিৎ দেবনাথ ও আদিত্য নস্কর থানায় পৌঁছালেন। পুলিশের আরেকটি দল ক্লিনিক থেকে ডেস্কটপ, হার্ডডিস্ক, এবং একগাদা পরিকল্পনামূলক নথি উদ্ধার করল। নথিগুলো ছিল তাদের সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের নীলনকশা —আত্মহত্যাগুলোর প্রতিটি ধাপ সেখানে নিখুঁতভাবে সাজানো ছিল।

তবে, পুলিশ বুঝতে পারছিল, সরাসরি প্রমাণ ছাড়া ঈশা ও সায়নকে ফাঁসানো সহজ হবে না। কারণ তারা কেউই নিজের হাতে কাউকে হত্যা করেনি। তাদের অস্ত্র ছিল মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ—এক গভীর খেলা, যা ভুক্তভোগীদের ধীরে ধীরে ঠেলে দিত আত্মবিনাশের পথে।  

সায়ন ও ঈশাকে আলাদা সেলে রাখা হলো। পুলিশের উদ্দেশ্য ছিল—একজনকে দিয়ে অপরজনের বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি আদায় করা। কিন্তু দুজনেই ছিল নীরব।  

সায়ন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছিল। পুলিশের সামনে কিছু না বললেও, তার মাথায় কেবল একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—  

সায়ন: “কোথায় ভুল হলো? আমরা তো সবকিছু নিখুঁতভাবে পরিকল্পনা করেছিলাম!”

অন্যদিকে, ঈশা ছিল সম্পূর্ণ ঠান্ডা মাথার। তার চোখে ছিল অদ্ভুত এক জেদ ও আত্মবিশ্বাস। পুলিশের হাতে সরাসরি কোনো প্রমাণ নেই, এটা সে ভালোভাবেই জানত। কিন্তু বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েও সে যেন আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছিল।  

পুলিশ আগের তিনটি আত্মহত্যার নথি খুঁটিয়ে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। প্রতিটি ঘটনাই ছিল নিখুঁতভাবে সাজানো—যেন আত্মহত্যাগুলি কোনো স্বাভাবিক মানসিক বিপর্যয়ের ফল, অথচ আসলে এগুলো ছিল পূর্বপরিকল্পিত মানসিক প্রভাবের পরিণতি। সঠিক প্রমাণের অভাবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা চালানো কঠিন হয়ে উঠছিল।  

তাই পুলিশ কৌশল পাল্টাল। তারা বুঝল, ঈশা ও সায়নের মধ্যে যদি যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রাখা যায়, তাহলে হয়তো দুর্বল জায়গা বের করা সম্ভব হবে।  

থানার ভেতরে তখনো ঈশা ও সায়ন নীরব। হয়তো ভাবছিল—কোনো পথ খোলা আছে কি না। কিন্তু এটাই কি সত্যিকারের শেষ? নাকি অদূর ভবিষ্যতে, অন্য কোনো নামে, অন্য কোনো ছদ্মবেশে, তারা ফিরে আসবে তাদের বিকৃত খেলায়?

রাত দশটার দিকে থানার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন সমরেশ, অপরাজিতা ও আদিত্য।  

সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আদিত্য মুচকি হেসে বললেন,

আদিত্য: “আপনারা এবার বিয়েটা করে নিন?”

সমরেশ ও অপরাজিতা একসঙ্গে তাকালেন, বিস্ময় প্রকাশ পেল তাদের চোখে।  

সমরেশ: “আপনি আমাদের ব্যাপারটা জানলেন কী করে?”

আদিত্য: (হাসি) “পঁচিশ বছর ধরে পুলিশে চাকরি করছি! এসব বুঝতে বেশি সময় লাগে না!” 

অপরাজিতা: (হেসে) “একে বিয়ে করলে তো আমাকে থেরাপি নিতে যেতে হবে!”

আদিত্য: “কোথাও যেতে হবে না! সাইকোলজিস্ট ঈশা রায় তো আপনার হেফাজতেই রয়েছে!”

তিনজন একসঙ্গে হেসে উঠলেন। রাতের ঠান্ডা হাওয়া সেই হাসির প্রতিধ্বনি বয়ে নিয়ে গেল দূরে, কলকাতার ব্যস্ত রাতের রাস্তায়।

এই রকম মনমুগ্ধকর অডিও স্টোরির সহযোগে বাংলা ছোট গল্প -এর আপডেট পেতে আমাদের WhatsApp চ্যানেল জয়েন করুন।

আমরা কারা

নতুন বাংলা ছোট গল্প

বিপরীত মন

"বিপরীত মন" একটি রহস্য রোমাঞ্চ বাংলা ছোট গল্প, যেখানে প্রেম, ক্ষমতা, এবং অপরাধের গভীর অন্ধকার দিক উন্মোচিত হয়। একটি মানসিক খেলার মাধ্যমে ঘটতে থাকে একের পর এক হত্যাকাণ্ড।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: বিপরীত মন

বরফ-হাঁসের উপহার

বরফের দেশে মিশা ও তার বন্ধুদের সাহসী অভিযানে উপহার উদ্ধারের জাদুকরী কাহিনি। ছোটদের গল্প ও রূপকথার গল্প ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও উৎসবের আনন্দে ভরপুর।

বরফের দেশে মিশা ও তার বন্ধুদের সাহসী অভিযানে উপহার উদ্ধারের জাদুকরী কাহিনি। ছোটদের গল্প ও রূপকথার গল্প ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও উৎসবের আনন্দে ভরপুর।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: বরফ-হাঁসের উপহার

জীবাণু দিয়ে হত্যা

সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত এক রহস্যময় বাংলা ছোট গল্প—বিষাক্ত সূচে যুবরাজের মৃত্যু, ভাইয়ের ষড়যন্ত্র, আর এক বিজ্ঞানভিত্তিক খুনের ইতিহাস যা আপনাকে শিহরিত করে তুলবে।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত এক রহস্যময় বাংলা ছোট গল্প—বিষাক্ত সূচে যুবরাজের মৃত্যু, ভাইয়ের ষড়যন্ত্র, আর এক বিজ্ঞানভিত্তিক খুনের ইতিহাস যা আপনাকে শিহরিত করে তুলবে।

সম্পুর্ন্য গল্পটি পড়ুন: জীবাণু দিয়ে হত্যা

1 thought on “বিপরীত মন”

  1. Hello, বিপরীত মন গল্পটা পড়লাম। খুব সুন্দর। এই গল্প নিয়ে যদি আমি কোনো শর্ট ফিল্ম বানাতে চাই, সেক্ষেত্রে নিয়ম কি আছে যদি জানান।
    যদিও আমি একজন খুব ক্ষুদ্র o সাধারণ মানুষ। একটি মাত্র শর্ট ফিল্ম বানিয়েছি। তাই চাই এই গল্প দিয়ে ও যদি বানানোর পারমিশন পাওয়া যায়।
    ধন্যবাদ
    কাজল দে
    দুর্গাপুর

Comments are closed.

অনুলিপি নিষিদ্ধ!

🔔 সাবস্ক্রাইব করুন! রিয়েল টাইমে মন্ত্রমুগ্ধকর অডিও স্টোরি সহযোগে নতুন নতুন বাংলা ছোট গল্পের আপডেট পেতে এখনই সাবস্ক্রাইব করুন! সাবস্ক্রাইব
অপেক্ষার সাতটা বছর – বাংলা রোমান্টিক ছোট গল্প অন্ধকার থেকে আলো – অনুপ্রেরণামূলক বাংলা ছোট গল্প শেষ ঠিকানা – রহস্য-রোমাঞ্চ বাংলা ছোট গল্প আবছা পা – ভুতের বাংলা ছোট গল্প সোনালি পালক – ছোটদের রূপকথার গল্প